একজন লালন-সাধক, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন

ম. মনিরউজ্জামান

উপমহাদেশের প্রখ্যাত লোকসাহিত্যবিদ মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ছিলেন বাংলা ভাষাভাষীর একান্ত কাছের মানুষ। লোকসঙ্গীত ও ঐতিহ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের প্রতি খেয়াল করলে প্রতীয়মান হয় একটানা ৬০/৬৫ বছর ধরে তিনি নিরলস প্রচেষ্টায় হারিয়ে যাওয়া লুপ্ত লৌকিক-ঐতিহ্য উদ্ধার করে বাঙালির আত্মমর্যাদা ও খ্যাতির পথ করেছেন সহজ-সুগম। যার নিদর্শন তাঁর সম্পাদিত একাদশ খÐে প্রকাশিত হারামণি নামক অবিস্মরণীয় গ্রন্থ। আবার সাধক কবি লালন ফকিরেরগান এবং লালনগীতির সূচিপত্র, সাধনত্ত¡ ও জীবন পরিচিতিসহ তাঁর ছেঁউড়িয়ায় স্মৃতিসৌধ র্নিমাণে মনসুরউদ্দিনের ভূমিকায় আজ লালনকে জানার ক্ষেত্রে হয়েছে অনেকটা প্রশস্ত।
কাঙাল হরিনাথ (১৮৩৩-৯৬), হিতকরী পত্রিকা, নবকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১৮৪৫-১৯০১), সরলা দেবী (১৮৭২- ১৯৪৫) ও রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) উদ্যোগে লালনের গান প্রকাশের মধ্য দিয়ে লালন চর্চার যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তার জের ধরে বসন্তকুমার পাল, কবি জমীমউদ্দীন, উপন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, মতিলাল দাশ প্রমুখসহ মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের প্রচেষ্টায় লালনচর্চার ধারা আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। এই অধ্যায়ে মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন লালনচর্চায় যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, সে কথা একালে আমাদের অনেকেরই জানা নেই।
পাবনার মুরারিপুর গ্রামে মনসুরউদ্দিনের জন্ম ১৯০৪ সালের ৩১ জানুয়ারিতে। এ অঞ্চলে লালনের জীবদ্দশা থেকে বসবাস করতেন লালনের ভক্ত-শিষ্যরা। সে সময়ে লালনের আখরাবাড়ি অর্থ্যাৎ সাধনপীঠ ছেঁউড়িয়া হতে পদ্মা পার হয়ে পাবনাতে যাতায়াত ছিল সহজ। এখনো বৃহত্তর পাবনায় লালনের অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীর খোঁজ মেলে। মনসুরউদ্দীনের সৌভাগ্য ঘটেছিল ছেলেবেলা থেকে লালন ভক্তশিল্পীদের সান্নিধ্যে গিয়ে তাদের কাছে গান শোনার। পরবর্তীকালে কলকাতার প্রবাসী পত্রিকায় ‘বাঁকির কাগজ মন তোর গেল হে হুজুরে’ লালনের এই গানটি সংগ্রহ কওে পাঠালে ১৩৩০ (১৯২৩) সালের আশি^ন সংখ্যায় ওটি ছাপা হয়। পড়ে অখÐ বাংলা দেশের নানা এলাকা থেকে ব্যক্তিগতভাবে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহযোগীর মাধ্যমে লোকসঙ্গীতের পাশাপাশি সংগ্রহ করতে শুরু করেন লালনের গান। সংগৃহীত গানগুলো স্থান পেয়েছে তাঁর সম্পাদিত হারামণির বিভিন্ন খÐে। এখানে উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, মনসুরউদ্দনের উদ্ধারকৃত লালনগীতি এবং অন্যান্য সংগ্রহ সম্পর্কে বিশিষ্ট বাউল গবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন: অশিক্ষিত গায়কের মুখে যাহা শুনিয়াছেন, অত্যধিক উৎসাহে কিছুমাত্র বাছ-বিচার না করিয়া তাহা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন এবং তাঁহার উপদেশ অনুযায়ী তাঁহার সংগ্রাহকগণও নির্বিচারে তাহাই করিয়াছেন। গানগুলি ‘যৎ শ্রæতং তৎ লিখিতং’-ভাবেই প্রকাশিত হইয়াছে।১
উপেন্দ্রনাথের মন্তব্য অবশ্য অসত্য নয়। তবু প্রসঙ্গত বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার, মনসুরউদ্দীনের সংগ্রহ-পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ফোকলোক সংজ্ঞা ওবৈশিষ্ট্যেও মাপকাঠিতে বর্তমানে গ্রহণযোগ্য। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টির উল্লেখ অপরিহার্য তা হচ্ছে, আজ অবধি উদ্ধারকৃত সব লালনগীতিকেই লোকসঙ্গীত রুপে নিরুপণ করা যায় না।প্রকৃত লোকসঙ্গীত একজন ব্যক্তি রচনা করার পর নানাজনের মাধ্যমে রুপান্তরিত হতে হতে উৎকৃষ্টতা লাভ করে। লালনগীতি সংগ্রহের ধারাবাহিকতায় পরিলক্ষিত হয়, লালন ফকিরের মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, বসন্তকুমার পাল, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, মতিলাল দাশ প্রমুখ মিলে ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে রক্ষিত কয়েকটি আদি খাতার অনুসরণে পাঁচ শতাধিক গান সংগ্রহ করেন। এইসব খাতার গানগুলো বানান ও অর্থহীন কিছু আঞ্চলিক শব্দ মুদ্রণকালে সামান্য রুপান্তর ঘটলেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আবার অন্যদিকে মূল কাঠামোর পরিবর্তন অধিকাংশ ক্ষেত্রে না হওয়ায় মনসুরউদ্দীন-সংগৃহীত এইসব লালনগীতি নতুনমাত্রায় কেবল গুরুত¦ই পাচ্ছে না, স্বতন্ত্র দিক-নিদের্শনারও পরিচয় বহন করছে। অর্থ্যাৎ তিনি মূলত মৌখিকসূত্রে সংগ্রহে করেছিলেন বলে লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য তাঁর সংগ্রহের মধ্যে পুরোপুরি উপস্থিত। তাছাড়া প্রধানত লোকমুখ থেকে লালনগীতি উদ্ধার করার কারণে বিভিন্ন জনপদে কিছু কছিু লালনগীতির পাঠভেদ কেমন এবং লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে তা কতটা প্রকৃষ্ট বা অনুৎকর্ষ, সেই নজিরও তাঁরসংগ্রহে পাওয়া যায়। নানাজনের সম্পাদিত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত লালনগীতি অবলম্বনে মনসুরউদ্দীন কঠোর পরিশ্রমে তৈরি করেছিলেন খÐিত লালন সঙ্গীতের সূচিপত্র। খÐিত এই সূচিপত্রের মাধ্যমে তিনি সুযোগ-সুবিধা করে দিয়েছিলেন লালন আলোচক, গবেষক কণ্ঠশিল্পী ও পাঠকদের।
১৩০৫ সালে বীণাবাদিনী নামক পত্রিকায় ‘পরমার্থিক গান’ শিরোনামে দুটি লালনগীতির স্বরলিপি প্রথম ইন্দিরা দেবী (১৮৭৩-১৯৬০) প্রকাশ করেন। ইন্দিরা দেবীর স্বরলিপি পরবর্তিতে মনসুরউদ্দীন অবগত ছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে প্রচলিত লালনগীতির স¦রলিপিতৈরির গুরুত্বও তিনি আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। স্বরলিপি করার জন্য কেউ তেমন আগ্রহী হচ্ছেন না দেখে এবং প্রচার মাধ্যমে সুরের বিকৃতি হচ্ছে বলে তিনি আক্ষেপ করে একটি গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন:
ঔালন শাহের জাতি ও ধর্ম লইয়া নানা বাক-বিতÐা হইতেছে। সুখের বিষয়। কিন্তু গানের সুর লইয়া কোনো প্রকার কাজ ও গবেষণা হইতেছে না। আমি নিজে গান জানি না এবং বুঝি না। লালন শাহের গানের দেশী স্বরলিপি ও বিদেশী স্বরলিপি (ংঃধভভ ঘড়ঃধঃরড়হ) আশু প্রয়োজন।২
লালনের প্রকৃত জীবনী সংগ্রহ করতে মনসুরউদ্দীন বারবার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে প্রথমউপকরণ পান তাঁর এক বন্ধুর কাছে। এ বিষয় তিনি জানিয়েছেন:
আমার কলেজ ফ্রেন্ড আহমদ হোসেন (ছন্দা গ্রামনিবাসী: কুষ্টিয়া মহকুমা) আমাকে ১৯২১-২২ খৃষ্টাব্দে লিখিয়াছিলেন, লালন শাহের বাড়ি চাপড়া বা ভাঁড়ারা।— লালন শাহকে মুসলিম তাঁতীরাই আশ্রয় দিয়াছিলেন। আশ্রয় বানাইয়া দিয়াছিলেন, জমি দান করিয়াছিলেন।৩
লালনের গান ও জীবনী সংগ্রহে মনসুরউদ্দীন প্রথম উদ্বুদ্ধ হন প্রবাসী (১৩২২/১৯১৫) পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক লালনগীতির সংগ্রহ দেখে। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর হারামণি প্রথম খÐের ভূমিকা এবং দ্বিতীয় খÐের আশীর্বাণী লিখে দেন। এ পর্যায় তিনি প্রথমদিকে লালনগীতি এবং তাঁর জীবনী সংগ্রহে পরামর্শ পান কথাশিল্পী ও সংবাদপত্রসেবী জলধর সেনের (১৮৬০-১৯৩৯) কাছে। মনসুরউদ্দীন লিখেছেন :
লালনের কয়েকটি গান “ভারতবর্ষে” প্রকাশার্থে প্রেরণ করিলে “ভারতবর্ষে” সম্পাদক শ্রীজলধর সেন বাহাদুর আমাকে একখানি পত্র লিখিয়া লালনের বিস্তৃত জীবনী ও তাঁহার গান সংগ্রহ করিবার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেন।৪
বিভিন্ন সময় নানা রচনায় মনসুরউদ্দীন জানিয়েছেন, লালন ফকির তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইয়ের কাছে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হলেও এই ধর্ম গ্রহণ ছিল তাঁর নামমাত্র।
মনসুরউদ্দীন উনিশ শ তিরিশের দশকে মুন্সী মোহম্মদ জসিমউদ্দীন নামে তাঁর এক আত্মীয়কে লালনের আখড়াবাড়ি ছেঁউড়িয়ায় পাঠান তথ্যসন্ধানে। তখন লালনের প্রধানশিষ্য ভোলাই শাহ জীবিত। ভোলাই শাহ এবং আরো একজন লালন শিষ্যের কাছ থেকে মুন্সী মোহম্মদ জসীমউদ্দীন কয়েকটি লালনগীতি ও সংক্ষিপ্ত লালন পরিচিতি সংগ্রহ করে মনসুরউদ্দীনকে দিয়েছিলেন। গানগুলো প্রথমে উদয়ন (১৯৩২?/১৩৩৯?) ও মাসিক মোহম্মদী (১৩৪৫) পত্রিকায় এবং পরে হারামণি দ্বিতীয় খÐে প্রকাশিত হয়।৫ হারামণি দ্বিতীয় খÐের একস্থানে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সত্যেন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রীর জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে লালনের হৃদ্যতা প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণ প্রকাশ করেছেন :
মিসেস [ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ] সত্যেন্দ্রনাথের ঠাকুর মহোদয়ার নিকট শুনিয়াছি যে তাঁহাদের শিলাইদহ অবস্থানকালে লালন প্রায়ই তাঁহাদের বোটে আসিতেন। লালনের সুদীর্ঘ বাবরী ছিল বলিয়া তিনি উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি প্রায় তাঁহাদিগকে গান শুনাইতেন।৬
লালন-প্রতিভার একটি সংক্ষিপ্ত রুপরেখা মনসুরউদ্দীন হারামণি দ্বিতীয় খÐে বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত সহজভাবে নিজস্বভঙ্গিতে।
লালন ফকীর অসাধারণ প্রতিভাবান কবি ও সাধক ছিলেন। তাঁহার রচিত পদাবলী পাঠেস্বতঃইহৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার হয়। সহজ সরল ভাষার মধ্যে কি অপরুপ ভাব ও সৌন্দর্য প্রকাশ পাইয়াছে। তিনি জটিল ও নিগূঢ় অধ্যাত্মসাধনা অতীব হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল ভাষায় তাঁহার রচনায় প্রকাশ করিয়াছেন। হিন্দু মুসলমানদের সম্মিলিত মরমিয়াবাদ তাঁহার চিত্তে প্রয়াগ সঙ্গমের সৃষ্টি করিয়াছে। এই লোক-কবির বাণী আজ আমাদের বড় প্রয়োজন।৭
বাউলগানের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুসমাজের গুরুবাদ এবং মুসলমানদের সুফিমতের মুরশিদ তত্তে¡ও প্রভাব রয়েছে, একথা বোঝাতে গিয়ে লালনের বাধাঁ গানকে অন্য আঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন :
তাঁর গানের প্রধান সুর হচ্ছে ভক্তিবাদ এবং গুরুবাদ। — এই গুরুবাদের জন্ম বৌদ্ধ ধর্ম এবং হিন্দু সমাজে কুলগুরু হিসেবে গৃহীত হয়। মর্শিদ বল্লে যা বোঝা যায়, গুরু বল্লে তাই বোঝায়।—
ভাষার সরলতায় এবং ভাবের গভীরতায় লালন শাহের গান বিশ^সুধীজন কর্তৃক সমাদৃত হবার দাবী রাখে। লালন শাহ্ লোককবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সমতুল্য। এত চমৎকার ভাষা লালন শাহ্ ব্যবহার করেছেন যে মুসলমান কবির রচনা তাঁর গানের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।৮
লালনগীতি প্রসঙ্গে মনসুরউদ্দীন আরো বলেন :
লালন শাহের গানের মধ্যে জীবনের স্পন্দন পাওয়া যায়— দাশরথি ও মধুকান এমন কি রামপ্রসাদের ভাষা হতেও উচ্চস্তরের ও অধিকতর ব্যঞ্জনাময়।৯
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের দেখাসাক্ষাৎ হওয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে প্রথম আলোকপাত করেন জলধর সেন।১০ কিন্তু মনসুরউদ্দীনই তাঁর নানা লেখায় বারবার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন গুরুত্ব সহকারে।
লালন-রবীন্দ্র সাক্ষৎ প্রসঙ্গে লালন জীবনী ও সমস্যা বইয়ের ভূমিকায় মনসুরউদ্দীন লিখেছেন :
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে হয়ত লালন শাহের অন্তিমজীবনে সাক্ষৎকার ঘটিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথের বোটে বসিয়াই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের একটি স্কেচ আঁকিয়াছিলেন।১১
লালন জীবনীর তথ্যপ্রাপ্তির জন্য উনিশ শ ষাটের দশকে তিনি ছেঁউড়িয়ার সন্নিহিত লালনের জন্মগ্রাম চাপড়া-ভাঁড়ারায় গিয়েছিলেন বলে মনসুরউদ্দীনের সংগ্রহকর্মেও এই সময়কালের সফরসঙ্গী লালনগীতি-সংগ্রাহক ছেঁউড়িয়া নিবাসী ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টুর (১৯৩৬-২০১১) ভাষ্যে জানা গেছে।১২ তিনি ষাটের দশকের পর প্রায় লালনোৎসবে অনেকবার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে এসেছেন। লালন-অনুসারী, ভক্ত ও স্থানীয় প্রবীণ-সুধীজনের সঙ্গে লালনপ্রসঙ্গ আলোচনা কওে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকের অজানা কিছু তথ্যও উদ্ধার করেছেন। যা একালে কেউ প্রচেষ্টা নিলে আর সম্ভব হবে না ওইসব ব্যক্তিদের মৃত্যুজনিত কারণে। এ পর্যায়ে উল্লেখ্য যে, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুর্তজা আলী (১৯০২-৮১) লিখিত একটি গ্রন্থ-সমালোচনার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে লিখেছেন :
সঙ্গীতজ্ঞ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সম্ভবত ছেঁউড়িয়াস্থিত লালন ফকিরের আশ্রমে যাতায়াত করিতেন। তিনি লালন শাহকে জানিতেন।— সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় কুষ্টিয়ার এসডিও ছিলেন। তিনি লালনের আখড়ায় যান নাই। সৈয়দ মুর্তজা আলী মরহুম, কুষ্টিয়ার নাম বদলাইয়া লালনশাহী করিতে চাহিয়াছিলেন। নানা বাধায় তাহা সম্ভব হয় নাই। তিনি লালন শাহের আখড়ায় যান নাই। — লালন শাহের আশ্রমের অধিবাসীরা বলেন যে রবি বাবু মশায় লালনের গান ব্যবহার করেন, এবং এই জন্য তিনি নোবেল প্রাইজ (১৯১৩) পান। গায়ক আব্বাস উদ্দীনও ঢাকায় কোনো এক সভায় ইহা উল্লেখ করেন।১৩
সাধক লালন ফকিরের মৃত্যু (১ কার্তিক ১২৯৭/১৭ অক্টোবর ১৮৯০) ঘটে তাঁর সাধনপীঠ ছেঁউড়িয়ায়।মৃত্যুর পর শিষ্য-ভক্তরাই তাঁর সমাধি রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। আম কাঁঠালে ঘেরা আর বাঁশবনের মধ্যে এই সমাধি এক সময় রবীন্দ্রনাথ বাঁধিয়ে দেন বলে কথিত আছে। প্রতিবছর দোল-পূর্ণিমায় লালনের জীবদ্দশা থেকে ‘সাধুসেবা’ নামে একটি উৎসব পালিত হচ্ছে। লালন অনুসারীরা হালে এই সাধুসেবার প্রাতিষ্ঠানিক আচার-উৎসব পালন কওে আখড়াবাড়ি বা স্মৃতিসৌধপাশের্^ ভক্তদের বাসগৃহে। একই সময়ে লালন একাডেমি স্মৃতিসৌধ ঘিরে যে উৎসব আয়োজন করে তার নাম, লালনস্মরণোৎসব। লালনের মৃত্যুর পরে আরো একটি স্মরণোৎসব উদ্যাপিত হয় প্রতি বছর ১ কার্তিকে।
জীর্ণ কাঁচাঘরের মধ্যে বাঁধানো সমাধি ঘিরে সাধক লালনের একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা সম্ভব; এই পরিকল্পনা প্রথম নেয়া হয়েছিল ১৩৪০(১৯৩৩) সালের চৈত্র মাসে। সে সময় উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, শচীন্দ্রনাথ অধীকারী (১৮৯৭-১৯৭৯) প্রমুখের প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিলালিত শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় ‘নিখিলবঙ্গ পল্লীসাহিত্য সম্মেলন’। ওই সম্মেলনে অবিভক্ত বাংলার জনসাধারণ ও সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জনানো হয়েছিল ছেঁউড়িয়ায় লালনের সাধনপীঠ কেন্দ্র করে তাঁর স্মৃতিরক্ষার জন্য।১৪ কিন্তু তা আর তখন বাস্তবায়িত হয়নি। পঞ্চাশের দশকের শেষে কিংবা ষাটের দশকের প্রথমে মনসুরউদ্দীন যখন প্রথম ছেঁউড়িয়াতে যান সে সময় স্থানীয় সুধীজন ও লালনভক্তদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পরিপ্রোক্ষিতে তাঁদেরকে লালনের সাধকপীঠ কেন্দ্র করে লালন-স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়ার অনুরোধ করেন। এই পরিকল্পনার ফলে সমকালের কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থার সহায়তায় হযরত নিজামউদ্দীনআউলিয়ার মাজারের অনুকরণে নির্মিত হয় লালন-স্মৃতিসৌধ।
এরমি কবি লালন ফকিরের স্মৃতিসৌধ অর্থ্যাৎ আখড়াবাড়িতে বাৎসরিক দুটি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও বর্তমানে সেখানে প্রতিদিন দশৃক-পর্যটকদেও সমাবেশ ঘটছে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই, লালন-স্মৃতিসৌধ র্নিমানের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন।
উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনী, লোকসাহিত্য প্রভৃতি মিলিয়ে মনসুরউদ্দীনের প্রায় ৪২ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও এরমধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠকীর্তি হিসেবে এগারোটি খÐে প্রকাশিত হারামণির নামই উচ্চারিত হয়। পাশাপাশি লালনচর্চার ধারাবাহিক ইতিহাসে নানাভাবে তাঁর যে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে সে প্রসঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই আজ উপেক্ষিত।

তথ্যনির্দেশ:
১. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য : বাংলার বাউল ও বাউলগান, তৃ-মু : কলিকাতা, ১৪০৮,পৃ. ৫৩৫-৩৬
২. ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ তারিখে লিখিত মুহম্মদ মনসুরউদ্দিনের ভূমিকা। দ্র, ম. মনিরউজ্জামান: লালন জীবনী ও সমস্যা, কুষ্টিয়া,অক্টোবর ১৯৭৮
৩. পূর্বোক্ত।
৪. মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন: ‘শাহ লালন ফকিরের গান’, বঙ্গবাণী অগ্রহায়ণ ১৩৩৩ কলিকাতা পৃ৪৫৩
৫. মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন: হারামণি, দ্বিতীয় খÐ, ঢাকা, দ্বি-স জানুয়ারি ১৯৬১। পৃ একত্রিশ-বত্রিশ
৬. পূর্বোক্ত, পৃ একত্রিশ
৭. পূর্বোক্ত,পৃ বত্রিশ
৮. মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন : হারামণি, পঞ্চম খÐ, ঢাকা, দ্বি-স মাঘ ১৩৯০, পৃ ২৩২-৩৩
৯. পূর্বোক্ত, পৃ ২২৭-২৮
১০. জলধর সেন : কাঙ্গাল হরিনাথ, প্রথম খÐ, কলিকাতা, ১৩২০, প ৃ২৩
১১. মুহম্মদ মনসুরউদ্দিনের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ তারিখে লিখিত ভূমিকা। দ্র. এ. মনিরউজ্জামান : পূর্বোক্ত।
১২. মুহম্মদ মনসুরউদ্দিনের চাপড়া-ভাঁড়ার গ্রামে তথ্যসন্ধানে যাওয়ার প্রসঙ্গ জেনেছি মনসুরউদ্দিনের সফরসঙ্গী ছেঁউরিয়ানিবাসী লালন-সঙ্গীত প্রথম-তৃতীয় খÐ গ্রন্থের সম্পাদক ও সংকলক ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহের সৌজন্যে।
১৩. সৈয়দ মুর্তজা আলীর গ্রন্থ-সমালোচনা(লঅলন জীবনী ও সমস্যা) জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র, ঢাকা থেকে প্রকাশিত বই পত্রিকায় মুদ্রিত হয় মার্চ ১৯৮৩ সংখ্যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বই জুলাই ১৯৮৩ সংখ্যায় মুহম্মদ মনসুরউদ্দিনের প্রতিক্রিয়াটি প্রকাশিত হয়েছিল।
১৪. দেশ,সাহিত্য সংখ্যা, কলকাতা ১৩৭৯, পৃ ২৯৭

তথ্যসূত্র: গদ্যমঙ্গল, সম্পাদনা: মতিউল আহসান, মিজান সরকার ও বিলু কবীর, প্রকাশক: সাহিত্য একাডেমি, কুষ্টিয়া, প্রকাশ কাল: ১৭ এপ্রিল, ২০১৩।