শামসুল হাদী : একাত্তরে কুষ্টিয়ার শ্রেষ্ঠ কমান্ডার

শাহাবুব আলী

বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হাদী। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার রাজনৈতিক ভূমিকা এবং অবদান ইতিহাসে খুব সঙ্গত কারণেই স্বীকৃত। সেই সময়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় কুষ্টিয়া জেলা ছিল পূর্ব পাকিস্থানের ১৯টি জেলার মধ্যে একটি। কুষ্টিয়া সদর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মহকুমা নিয়ে ছিল কুষ্টিয়া জেলা। রাজনৈতিক কাঠামোতেও এই তিনটি মহকুমা একীভূত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার বিশেষ অবদান যে স্বীকৃত, তার উল্লেখযোগ্য কতকগুলি ভৌগলিক এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ ছিল। যেমন : ১। কুষ্টিয়ার মুজিবনগর ছিল যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের রাজধানী, ২। যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান হয়েছিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় ভবেরপাড়ার আম্রকাননে, ৩। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া কনস্টিটিউয়েন্সির তৎকালীন এমএনএ, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের (যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে বিপ্লবী সরকারের প্রধামন্ত্রী এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রধান নেতা জনাব তাজউদ্দিন আহম্মেদের সার্বক্ষণিক সহকারী ছিলেন) অগ্রণী ভূমিকা ছিল, ৪। ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক জনাব তাজউদ্দিন আহম্মেদ ব্যরিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সাথে এবং সহযোগিতায় কুষ্টিয়া হয়ে ভারতে পৌছেছিলেন, ৫। কুষ্টিয়ায় অবস্থানকারী পাকিস্তানি আর্মির ২৬-ডি কোম্পানিকে কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিচক্ষণ পরিকল্পনায় এবং তৎকালীন ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র-জনতার সহায়তায় প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধে পরাজিত করে সমগ্র বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলাকে ১৬ দিন স্বাধীন রেখেছিল। উল্লেখ্য যে, একমাত্র কুষ্টিয়া জেলাই এধরনের বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল, ৬। কুষ্টিয়ার শহর এবং গ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ৫০টির অধিক সমুখযুদ্ধ হয়েছে। তার মধ্যে কুষ্টিয়া শহর হতে দক্ষিণে বংশিতলার যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ৭। ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে কুষ্টিয়া শহরের প্রবেশমুখে চৌড়হাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যৌথবাহিনীর ভীষণ যুদ্ধ হয়, সেই যুদ্ধে তিন শ’র অধিক মিত্রসেনা প্রাণ উৎসর্গ করেন।
নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ায় শতাধিক গ্রুপ কমান্ডার যে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তার গল্প এই জেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে ছড়িয়ে পড়ে। এই বীর কমান্ডারদের মধ্যে শীর্ষ-কমান্ডার হিসাবে শামসুল হাদীর নাম যে কোনো বিচারেই অগ্রগণ্য। আমি সেই সাহসী কমান্ডারের প্রধান সহকর্মী ও সহযোদ্ধা হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে এই বীর-অকুতো ভয় মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হাদীর জন্ম, ছাত্রজীবন, কর্মজীবন, চিন্তাচেতনা, সংগ্রাম এবং মৃত্যু প্রসঙ্গে আমাদের জানা থাকা দরকার কেননা যতটুকু অনুভব করি বিষয়গুলো অনেকেরই অজানা এবং বিস্মৃত। এমন পরিণতিই আমাদের নিজেকে জানা এবং সমষ্টির গৌরবকে সমুন্নত রাখার পরিপন্থি। এই সামাজিক চেতনা এবং অন্তরের দায়বোধ থেকেই খণ্ডিত রচনাটি দাঁড় করানোর প্রয়াস। মুক্তিযোদ্ধা শাসসুল হাদী বিষয়ে এটি কোনো সম্পন্ন রচনা নয়।


জন্ম ও পরিচয়: সংগ্রামী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা-কমান্ডার শামসুল হাদী কুষ্টিয়া জেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ হাটশহরিপুর ইউনিয়নের পুরাতন কুষ্টিয়া গ্রামে ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোঃ নূরুল ইসলাম এবং মায়ের নাম বেগম শামসুন্নাহার। এককালের প্রমত্তা গড়াই নদীর এ-পাড়ে কুষ্টিয়া শহর, ও-পাড়ে হরিপুর, হাটশহরিপুর, পুরাতনকুষ্টিয়া, কয়া, গৈট্টা এইসব গ্রাম। স্থানিক অভ্যাসে শহরের মানুষজন নদীর ওপাড়ের জনপদগুলোকে গড়ে হরিপুর’ বলে। হরিপুর বা পুরাতন কুষ্টিয়া অবিভক্ত ভারত-আমলে বা ব্রিটিশ পিরিয়ডে শিক্ষা, সাহিত্য, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনেকখানি অগ্রগামী হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল। এই অঞ্চলেরই একটি গ্রাম কয়া। এই কয়া ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীর সংগ্রামী নেতা বাঘা যতীনের মামাবাড়ি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি এই এলাকার সাথে লাগোয়া এবং বলা বাহুল্য এইসব জনপদ উক্ত ঠাকুর-জমিদারির এলাকাভুক্ত ছিল। ঠাকুরবাড়ির উত্তর পাশে কীর্তিনাশা পদ্মানদী এবং দক্ষিণে প্রবাহিত পদ্মারই শাখা গড়াই। বাউল শিরোমণি ফকির লালন শাহের ছেঁওড়িয়ার আখড়া, সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা লাহিনীমোহনপুর, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ও রায়বাহাদুর জলধর সেনের কুমারখালীও এই এলাকাভুক্ত। ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন উক্ত কয়া গ্রামেরই সন্তান। গগন হরকরা, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, কাজী মিয়াজান, জ্যোতিষচন্দ্রপাল, অতুলকৃষ্ণ বোস, মৌলভি আফছার উদ্দিন আহমেদ, মৌলভি শামসুউদ্দিন আহমদ প্রমুখ এতদঞ্চলেরই সন্তান। এছাড়াও বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় জন্ম নিয়েছেন জাতিক এবং আন্তর্জাতিক মাপের বহু মানুষ। যারা সামাজিক-রাজনৈতিক-সাস্কৃতিক-ক্রিড়াক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তাদেরই উত্তরসূরি-কুশীলব হলেন আলোচ্য সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হাদী।
বর্তমানে কুষ্টিয়া প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠার আগে পুরাতন কুষ্টিয়াইযে মূল কুষ্টিয়া ছিল তা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এই পুরাতন কুষ্টিটাতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন হাদী। তার বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর তখন তাদের পরিবার বর্তমান কুষ্টিয়া শহরে এসে বসতবাড়ি স্থাপন করে। সেই সুবাদে হাদীর প্রাথমিক পর্বের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয় কুষ্টিয়া শহরে। নদীভাঙন এবং কর্মসংস্থানের সুবিধার্থে সেই সময় অনেক পরিবারই হরিপুর হতে কুষ্টিয়া এবং শহরের কাছাকাছি জনপদগুলোয় বসবাস শুরু করে। হাদীর বাবারও কর্মস্থল ছিল কুষ্টিয়া শহরে। অতএব, হরিপুর ছেড়ে তাদের কুষ্টিয়ায় চলে আসার এটি ছিল অন্যতম প্রধান কারণ।।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হাদী ছিলেন মেধাবী ছাত্র। সততা, দৃঢ়তা এবং সংগ্রামমনস্কতা ছিল তার চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ষাটের দশকের মধ্যভাগে তিনি স্কুলের লেখাপড়া শেষ করেন। এরপর ভর্তি হন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে। স্কুলের ছাত্র থাকাকালেই রাজনীতির সাথে নিজেকে জড়িত করেছিলেন। ক্লাশের বই পড়া ছাড়াও অন্যান্য বই, পত্রপত্রিকা পাঠে তার বিশেষ মনোযোগ এবং অভ্যাস ছিল। বাষট্টি থেকে ছেষট্টির আন্দোলনসহ আইয়ুববিরোধী ছাত্রজনতার সকল আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্কুলজীবনের শেষদিকেই সেই সময়ের প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্রসংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’এর সদস্য হন। এই পথ ধরে ধীরে ধীরে তিনি ছাত্রনেতা হয়ে ওঠেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই হাদী তৎকালীন ছাত্রনেতৃবৃন্দ এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের দৃষ্টিআকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সেই বাষট্টি থেকে যারা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন তাদের মধ্যে নূর আলম জিকু, আব্দুল বারী, আনোয়ার আলী, আকরাম আলী মুক্ত, আনিসুজ্জামান আনিস, আবুল মোমিন প্রমুখ হাদীর প্রতি মুদ্ধ ছিলেন তার সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে। এ ছাড়াও বিবিধ কারণে হাদীর প্রতি তাদের সেই-ভালোবাসাও ছিল অনেক বেশি।
১৯৬৯ সালের যে গণআন্দোলন, তার পূর্বপ্রস্তুতির নিকটঅতীতের উত্তাল কালপর্ব, তখন এই গণআন্দোলনের যে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছিল, কুষ্টিয়া পর্যায়ে সে ক্ষেত্রে হাদির ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। শহরের জিলা স্কুল, মুসলিম হাইস্কুল, ইউনাইটেড হাইস্কুল, বিদ্যাপীঠসহ সকল স্কুলে নিজ কর্মদক্ষতা এবং তৎপরতার সুবাদে তিনি ছাত্রনেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। জেলার গ্রামপর্যায়ের স্কুলগুলোতেও তার কর্মতৎপরতা বিস্তৃত ছিল। সেই সময়ে পূর্বপাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তক্রমে পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি বই নবমশ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য পাঠ্য হিসাবে চালু করা হয়। এর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ভিত্তিক সংগ্রাম গড়ে তোলা হয়েছিল। মূলদলের নেতৃবৃন্দ এর নেপথ্যে পরামর্শক হিসাবে কাজ করতো, আর দৃশ্যপটে কাজ করতেন ছাত্রনেতারা। তখন এজন্য যে স্কুলভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তাতে ছাত্রলীগের পক্ষে শাসসুল হাদী বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঠিক এই সময়টিতে তার সাথে আমার পরিচয় হয়। আমি তখন কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে ক্লাশ নাইনের ছাত্র। নিজ বিদ্যালয়ের পক্ষে ঐ ক্ষেত্রে আমাকে ভূমিকা নিতে হয়েছিল। স্কুল পর্যায়ের ঐ আন্দোলন এজন্য ব্যাপকতা লাভ করেছিল যে, ঐ বইটিতে বাঙ্গালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন ছিল। হাদী ভাইই আমাদেরকে তকালীন জেলা ছাত্রলীগের অফিসে যাওয়া-আসার জন্য উৎসাহী করেছিলেন। রাজনীতিক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় মেধাবী ছাত্রদেরকে আকর্ষণ করার বিষয়ে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই সূত্র এবং কর্মতৎপরতার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের সাথে তার সম্পর্ক সুগভীর হয়।
১৯৬৯ সালে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে আব্দুল জলিল সভাপতি এবং শামসুল হাদী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের এই কমিটিতে সমাবেশ ঘটে একদল যোগ্য ও মেধাবী নেতৃবৃন্দের। এই কমিটির সাধারণ সম্মদিক হিসাবে হাদীর কর্মতৎপরতা তাকে সমগ্র জেলায় বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। জানামতে, সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে জেলা পর্যায়ের যে সকল ছাত্রনেতার একান্ত সম্পর্ক ছিল, হাদী তাদেরই একজন। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে। এই বিশাল বিজয় অর্জিত হবার পেছনে, বলাই বাহুল্য, আওয়ামী লীগের সবিশেষ কর্মতৎপরতা ছিল। এক্ষেত্রে দেশব্যাপী ছাত্রলীগের তৎপরতাও ছিল ব্যাপকভিত্তিক। কুষ্টিয়া জেলাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এরই ফলশ্রুতিতে সংঘটিত মহান মুক্তযুদ্ধেও ছাত্রলীগের যে বিশেষ বীরত্বব্যঞ্জক বিচক্ষণ অবদান ছিল, সেখানেও কুষ্টিয়া ব্যতিক্রম নয়। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, এর কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল দলের কিছু কিছু নেতার তুলনায় ছাত্রলীগের কর্মীদের ভূমিকাই বেশি ছিল। বিশেষত কুষ্টিয়ার ক্ষেত্রটিতে জাড়িত থাকার সুবাদে আরও নিবিড়ভাবে বিষয়টিকে চাক্ষুষ করার সুযোগে আমার হয়েছিল। এই পর্যায়ে হাদী ভাইয়ের অবদানযে খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল, সেই বিষয়টি তুলে ধরাতেই এতো কথার অবতারণা। এক্ষেত্রে জেলার প্রত্যেকটি থানায় তার দৌড়ঝাপের তুলনা হয় না। যথার্থই তিনি ছিলেন জ্ঞানী ছাত্রনেতা। তার সাথে জেলার আর যেসব নেতা বিশেষ তৎপর ছিলেন, তারা হলেন : মিরপুরের প্রখ্যত কৃষকনেতা মারফাত আলী, কুমারখালীর পরিমল কুমার বিশ্বাস, কুষ্টিয়া সদরের অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মাসুম, খোকসার আলাউদ্দিন প্রমুখ।
বাঙ্গালি জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ যে রাজনৈতিক ঘটনা, সেটি হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে হাদীভাইয়ের এবং তার পিতৃপরিবারের বিশেষ অবদান রয়েছে। শামসুল হাদীরা সাত ভাই । চার ভাইই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। এই ধরনের পরিবার কুষ্টিয়াতে কমই আছে বলা যায়। ছাত্রনেতা হাদীভাই অকুষ্ঠ চিত্তে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। যদিও আগ থেকেই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যারা তার প্রতি বিশেষ অনুরক্ত এবং অনুগত ছিলেন, তিনি আগে তাদেরকে নিয়ে প্রথম ব্যাচে বিহারের চাকুলিয়ায় ট্রেনিং করিয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হন। তিনিই প্রথম কুষ্টিয়া সদরের দুর্বাচারাতে গেরিলা ঘাঁটি গড়ে তোলেন। সংগঠক এবং নেতা হিসাবে তিনি কেন্দ্রে অবস্থান করে যুদ্ধের সংগঠন ও সংঘনের খাজ সম্পাদন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে শাসসুল হাদী জেলাশহরের চার পাশে গিয়ে গিয়ে বিশ্বস্ত যোদ্ধাগ্রুপ বা এফএফ. ইউনিট গড়ে তোলেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, পরে ট্রেনিং শেষ করে দুর্বাচারাতে এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। যুদ্ধদিনে সেটা ছিল ১৪ই আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। দুর্বাচারা হতে কুষ্টিয়া শহরের দূরত্ব সাত মাইল। সেখান থেকে তিনি ঐ দিন কুষ্টিয়া শহরে আক্রমণ চালানোর সাহসী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সহযোদ্ধা হিসাবে আমাদেরকে তিনি ব্রিফ করেন : “আমরা মোল্লাতেঘরিয়ার ব্রিজের ক্যানেলকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ১৩ই আগস্টের দিনগত রাতে, ১৪ই আগস্টের পথম প্রহরে, মানে মধ্যরাতে গুলিবর্ষণ করেই দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে আসবো। এতে করে শত্রুদের স্বাধীনতা দিবস পালনের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে এবং ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য মোল্লাতেঘরিয়ার মন্টু এবং নেহাল ভাইয়ের কাছে হাদী ভাই আগেই লোক পাঠিয়ে দেন। এরপর গুলিবর্ষেণের ঐ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য হাদী ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ১৫ জনের একটি গেরিলা গ্রুপ মোল্লাতেঘরিয়ায় যাই। মন্টু ভাইয়ের সহায়তায় টানা পাঁচ মিনিট ধরে গুলি বর্ষণের পর আমরা সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা মোতাবেক নিরাপদ স্থানে ফিরে আসি। পরে জানতে পারি এই ঘটনায় পাকিস্তানি সেনারা বিশেষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।
এইসব অপারেশন রচনা করার ক্ষেত্রে হাদী ভাইয়ের সাহস, বিচক্ষণতা এবং যুদ্ধজ্ঞানের কথা বিস্মৃত হবার নয়। পাকিস্তানি আর্মি এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামুস ও পিস কমিটির সদস্যদের গতিবিধি নখদর্পণে রাখার জন্য তিনি গোপন অনুচর-নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এই নেটওয়ার্কে নিয়োজিতরা দুতিয়ালীর কাজ করতেন। কুমারখালীর রাজাকার কমান্ডার, লোকটার নাম ফটিক। কমলাপুর বাজারের পাশে দুধকুমড়া গ্রামে তার বাড়ি। এক রাতে আমরা এই বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার ছোটো ভাইকে ধরে আনলাম। তার নাম বাদশা। এরপর ফটিক এসে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে তার ভাইকে ছেড়ে দেয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করে। তাকে এভাবে আমাদের ঘাঁটিতে আনাই ছিল হাদী ভাইয়ের কৌশল। এক পর্যায়ে শর্ত দেয়া হয় যে, তার ভাইকে আমরা ছেড়ে দেব এবং তাকেও হাতে পেয়ে কিছুই করবো না। বিনিময়ে সে আমাদের পক্ষে কাজ করবে। বিশেষ করে পাকসেনারা কখনো দুর্বাচারা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে তা আমাদেরকে জানাবে। এই শর্তে রাজাকার ফটিক রাজি হলে পর আমরা তার ভাইকে ছেড়ে দিই। এই সময় হাদী ভাই তাকে মটিভেট করেন, কেন এখন তার বা সবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করাটা দরকার। শর্তের নড়চড় হলে তার অবস্তা খারাপ হয়ে যাবে সে কথা তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিলো। যাইহোক তার ভাইকে ছেড়ে দিলে তারা, ফটিক এবং বাদশা বিদায় নিলো। ফটিক রাজাকার আমাদের সাথে রাজাকারি করেনি। সাথে সাথেই সে গোপনে এক চিঠির মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, ওমুক তারিখে দুর্বাচারাকে আক্রমণ করার জন্য পাকবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার চিঠির সূত্র ধরেই আমরা বংশিতলায় অ্যাম্বুশ স্থাপন করি। একসময় আমাদের অপেক্ষার পালা শেষে পাকসেনারা সত্যিই যখন বংশিতলায় আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো, তখন ফটিকের দেয়া তথ্য আমাদের কাছে সত্য প্রমাণিত হলো। সেটি ছিল ৫ই সেপ্টেম্বর । ভয়াবহ সেই যুদ্ধে আমাদের ১১ জন সহযোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করে। অন্যপক্ষে ষাট থেকে সত্তর জন পাকসেনা মৃত্যুমুখে পতিত হয়। সেই যুদ্ধের কথা স্পষ্ট মনে আছে, মনে আছে ফটিকের সহযোগিতার কথা, একই সাথে বিস্মৃত হবার নয় এইভাবে ফটিককে ব্যবহার করে যুদ্ধেজেতায় শামসুল হাদী ভাইয়ের সেনাপতিসুলভ যুদ্ধকৌশলের কথা।
এইসব নানা কারণেই হাদী ভাইয়ের সাংগঠনিক দক্ষতা, যুদ্ধ পরিকল্পনার নৈপুণ্য, সাহস, অক্লান্ত পরিশ্রমক্ষমতা, নেতৃত্ব, নির্মোহ দেশপ্রেম সকলের কাছে সুস্পষ্ট রেখায় ফুটে উঠেছিল। এইসব গুণের বহিঃপ্রকাশই জেলার সর্বশ্রেষ্ট কমান্ডার হিসাবে তাকে স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঘরে ফেরেন হাদী ভাই। যুদ্ধোত্তর দেশে যা হয়, বাংলাদেশের নিয়তিও তার বাইরে যেতে পারেনি। নানা ক্ষেত্রে স্বপ্নভঙ্গ ঘটে, কিন্তু তার পেছনে ছিল অসঙ্গততর কারণ। ফলে যুদ্ধফেরৎ মানুষদের মধ্যে দ্বৈধতার সৃষ্টি হয় স্বাভাবিকভাবেই। হাদী ভাইয়ের ভেতরেতে আগে থেকেই রাজনৈতিক প্রতিবাদী, বিপ্লবী প্রজ্ঞা ছিল। তারওপর যুদ্ধফেরৎ একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে কর্তব্য ও দায়বোধের তাড়না থেকে তিন বিমুখ থাকতে পারেন না।
যদূর মনে পড়ে সেটা ৭২-৭৪ এর কথা। জন্ম হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ-এর। এতে বেশির ভাগ মেধাবান এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মুক্তিসেনারা যোগদান করেন। তাদের বেশির ভাগেরই ছিল দেরাদুনের প্রশিক্ষণ। নেতৃত্বের দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই চলে আসা শামসুল হাদীর ওপর। একপর্যায়ে জাসদকে প্রায় আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে রূপান্তরিত হতে হয়। এই রকমের অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিকরাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৯৭৪ সালের মে মাসের ১১ তারিখে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ছাতারপাড়া গ্রামে হাদিভাইয়ের দলটি রক্ষীবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। হাদী ভাইয়ের নেতৃত্বে তার দল বলা যায় রক্ষীবাহিনীর সাথে এক চরম মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাতে মুসা, উম্বর, কাল, খলিল প্রমুখ ১৩ জন সহযোদ্ধাসহ হাদিভাই ব্যুলেটবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন। এক ধরনের দমন দাপটের ত্রাস সৃস্টির মোহে বা অজ্ঞাত কারণে হাদিভাইয়ের মৃতদেহ কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর বাঁধে সারাদিন উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল। অবশেষে তার মৃতদেহের অন্তিম সৎকার করা হয়।
নিজের চেতনা এবং দেশবোধের সাথে প্রতারণা না-করা সেই বীর মুক্তিসেনাকমান্ডার শামসুল হাদীর প্রতি এই সামান্য সহযোদ্ধার হেলমেটমুক্ত উঁচুশির স্যালুট। বিউগলের করুণ সুরে তার স্বপ্ন অভিব্যক্ত হোক। হাদী ভাইয়ের মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা নয়, বরং থাই পাহাড়ের মতোই ভারি। মহাকল নিশ্চয়ই তার মূল্যায়ন করবে।

————————————————–

সাহাবুব আলী: বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষকনেতা।
তথ্যসূত্র: বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড), সম্পাদনা: বিলু কবীর, সিকদার আবুল বাশার, গতিধারা, ঢাকা, প্রকাশ কাল: সেপ্টেম্বর, ২০১৭।