কুষ্টিয়া যুদ্ধ

রফিকুল ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে কুষ্টিয়ায় সশস্ত্র গণঅভুথান ইতিহাসের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হবে। কুষ্টিয়ায় উত্তাল জনতার গণবিদ্রোহ, যারা সেদিন স্বচক্ষে দেখেছেন- তারা আমাদের সাথে একমত হবেন- এত বিদ্রোহ, কেউ কখনো দেখেনি। হাজার হাজার জনতা ঢাল, সড়কি, বল্লম নিয়ে যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি নিলো। গগনবিদারি জয় বাংলা শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলো। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসী তরুণেরা ও বাঙালি সৈনিকেরা অমিততেজ অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা ধরে যে মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানের মহান প্রত্যয়ে- সুমহান দেশপ্রেমের অঙ্গীকারে সংগ্রামী মানুষের কাতারে সামিল হয়েছিলেন ইতিহাসে তাদের অনেকের নামই কখনো উল্লেখ থাকবে না- তবু সেই মহাজাগরণের অবিস্মরণীয় মুহুর্তে জাতির ক্রান্তিলগ্নে দেশের চরম দুর্দিনে অস্ত্র হাতে যারা লড়াই করেছিলেনইতিহাস ব্যর্থ হলেও তারা অনাদিকাল পর্যন্ত বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধপরিকল্পনা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুসারে ২৫ মার্চ রাতে যশোর সেনানিবাস থেকে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের এক কোম্পানী সৈন্য কুষ্টিয়া শহরে এসে অবস্থান গ্রহণ করে। পাকবাহিনী কুষ্টিয়া শহরে ত্রিশ ঘণ্টার জন্য সান্ধ্যআইন জারি করে এবং টহল দিতে থাকে।
পাকসেনাদের অধিনায়ক ছিল মেজর শোয়েব। ক্যাপ্টেন শাকিল, ক্যাপেন সামাদ ও লে, আতাউল্লাহ শাহ মেজর শোয়েবের অধীনস্থ অফিসার হিসেবে এই কোম্পানীর সাথে কুষ্টিয়ায় অবস্থান করছিল। পাকবাহিনীর সঙ্গে ছিল ১০৬ এমএম, জিপ আরোহিত রিকয়েললেস রাইফেল, ভারী ও হালকা চাইনিজ মেশিনগান, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, শক্তিশালী বেতারযন্ত্র এবং প্রচুর পরিমাণ গোলাবারুদ। ২৫শে মার্চ রাতে পাকবাহিনী কর্তক ইপিআর বাহিনীর আক্রান্ত হওয়ার খবর এবং কুষ্টিয়ায় পাকসেনাদের আগমনের খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ইপিআর (বর্তমানে বিডিআর)-এর যশোর সেক্টরর নিয়ন্ত্রণাধীনে ৪নং উইংএর সদর দপ্তর অবস্থিত ছিল চুয়াডাঙ্গা মহকুমা শহরে। মেজর এমএ ওসমান চৌধুরী (বাঙালি, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত লে, কর্ণেল) ‘৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমপাকিস্তন থেকে বদলি হয়ে উইং কমাণ্ডারে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ক্যাপ্টেন এআর আযম চৌধুরী (বাঙালি, বর্তমানে লে. কর্ণেল) ও ক্যাপ্টেন সাদেক (পাঞ্জাবি) সহকারী অধিনায়ক ছিলেন। পাঁচটি কোম্পানী ও একটি সাপোর্ট প্লাটুনের সমন্বয়ে গঠিত ছিল ৪নং – উইং। প্রত্যেকটি কোম্পানী প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল।
একটি কোম্পানীতে পাঁচটি হালকা ট্যাংকবিধ্বংসী কামান, সাতটি হালকা মেশিনগান, একটি মেশিনগান এবং বাকী ৩০৩ রাইফেল ছিল। উইং সদর দপ্তরে এক কোম্পানী সৈন্য ছাড়াও ছয়টি ৩ ইঞ্চি মর্টার ও ২০০ চাইনিজ স্বয়ংক্রিয় রাইফের ছিল। এ ছাড়া একটি ব্যাটালিয়ন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য গোলাবারুদ ও যানবাহন ৪নং উইং-এ ছিল।

৪ নং উইংয়ের পাঁচটি কোম্পানীর অবস্থান ছিল নিম্নরূপ :
এক : প্রাগপুর এলাকা এ’ কোম্পানী কমাণ্ডার সুবেদার মোজাফফর আহমদ। দুই : ধাপখালী এলাকা ‘বি’ কোম্পানী কমাণ্ডার সুবেদার খায়রুল বাশার খান। তিন : বৈদ্যনাথতলা (মুজিবনগর)- “সি’ কোম্পানী-কমাণ্ডার সুবেদার মুকিদ । চার : যাদবপুর এলাকা- “ডি’ কোম্পানি কমাণ্ডার সুবেদার মজিদ মোল্লা। পাঁচ : উইং সদর দপ্তর- ‘ই’ কোম্পানী কমাণ্ডার সুবেদার রাজ্জাক।
এছাড়া সিগন্যাল প্লাটুন হাবিলদার মুসলেম উদ্দিনের অধীনে উইং সদর দপ্তরে অবস্থান করছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে উইং কমাণ্ডার মেজর এমএ ওসমান চৌধুরী। পাঁচজন কোম্পানী কমাণ্ডার, সিগন্যাল প্লাটুন কমাণ্ডার ও সাপোর্ট প্লাটুন কমান্ডার সবাই বাঙালি ছিলেন। সাধারণ সৈনিকরাও প্রায় সবাই বাঙালি ছিলেন।
মেজর ওসমান চৌধুরী ২৫শে মার্চ রাতে সস্ত্রীক কুষ্টিয়া সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন। ২৬শে মার্চ সকাল ১০টায় সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতার থেকে নতুন নতুন সামরিক বিধি জারি করতে থাকে। অবিলম্বে মেজর ওসমান ঝিনাইদহ হয়ে চুয়াডাঙ্গার পথে যাত্রা শুরু করেন। তিনি বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঝিনাইদহ পৌছালে উত্তাল জনতা তাঁর জিপ ঘিরে ধরে। জনতাকে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য আহবান জানিয়ে তিনি চুয়াডাঙ্গার দিকে অগ্রসর হন। মেজর ওসমান চৌধুরী বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া পীলখানায় মর্মান্তিক ঘটনার বিবরণ জানতে পারলেন। হাবিলদার মেজর মজিবর রহমান (শহিদ) এর আগে কোনো নির্দেশ ছাড়াই কৌশলে সদর দপ্তরে কর্মরত সকল অবাঙালি ইপিআর সদস্যদের বন্দি করেছিলেন এবং সমস্ত্র অস্ত্র অস্ত্রাগার থেকে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রেখেছিলেন। শহরের ছাত্র, শ্রমিক ও মেহনতি জনতা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিল। ইপিআর-এর বাঙালি সৈনিকেরা সচেতন বাঙালি হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি ছিল। স্বদেশের জন্য জীবন দেয়ার উন্মাদনা সৈনিক ও জনতার মধ্যে সৃষ্টি করেছিল এক অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র।
মেজর ওসমান চৌধুরী পরিস্থিতি সম্যক উপলব্ধি করে ২৬শে মার্চ চুয়াডাঙ্গা পৌছেই এক জরুরি সভা ডাকলেন। ক্যাপ্টেন এআর আযম চৌধুরী, ডা, আসহাবুল হক, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ কর্মকর্তাগণ এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার পরিস্থিতি, হানাদার বাহিনীর অঘোষিত যুদ্ধ ও গণহত্যা পর্যালোচনা করে এই সভায় এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় শপথ গ্রহণ করা হয়। ঐদিন বেলা আড়াইটার সময় হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে মেজর ওসমান চৌদুরী বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ইপিআর-এর বাঙালি সৈনিকেরা পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশের পতাকাকে সামরিক অভিবাদন জানায়।
ক্যাপ্টেন আযম চৌদুরী সকল বিওপিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার নির্দেশ দেন। চুয়াডাঙ্গা-যশোর সড়ক ও দামুরহুদা-চুয়াডাঙ্গা-জীবননগর সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা করা হয়। ২৭শে মার্চ সকালে যাদবপুর অবস্থানরত কোম্পানী কমাণ্ডার-সুবেদার-আবদুল মজিদ মোল্লা অয়ারলেসে মেজর ওসমান চৌধুরীকে জানালেন যে পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন সাদেক মাসলিয়া বিওপিতে এসেছে। মেজর ওসমান ক্যাপ্টেন সাদেকের প্রতি দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেন। ক্যাপেন সাদেক ও বাঙালি ইপিআর সৈনিকদের নিরস্ত্র করার জন্য মাসলিয়া বিওপিতে প্রবেশ করে। ক্যাপ্টেন সাদেকের সাথে কয়েকজন অবাঙালি সৈনিক ছিল কিন্তু তার ড্রাইভার ছিল বাঙালি। ক্যাপ্টেন সাদেক যাদবপুর কোম্পানী সদর দপ্তরে এসে বাঙালি গার্ডের সাথে অশোভন আচরণ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। ক্যাপ্টেন সাদেক ও তার সহযোগীরা সকলেই নিহত হয়। এই আকস্মিক সংঘর্ষের পরে মেজর ওসমান প্রশাসনিক বিষয় সামরিক ও বেসামরিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। ডা, আসহাবুল হক সংসদসদস্য, অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী ও ব্যারিস্টার বাদল রশীদ এই উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন। উপদেষ্টা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মেজর ওসমান সীমান্তে অবস্থানরত সব ইপিআর, সৈনিক চুয়াডাঙ্গা সদর দপ্তরে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং প্রাগপুরের কোম্পানী কমাণ্ডার-সুবেদার মোজাফফরকে কুষ্টিয়ার পথে অভিযান শুরু করার আদেশ দিলেন।
কুষ্টিয়া শহরে পাকবাহিনী তখন তিন জায়গায় অবস্থান করছিল : কুষ্টিয়া জিলা। স্কুল, পুলিশলাইন ও অয়ারলেস স্টেশন। তিন দিক থেকে একই সময়ে যুগপৎ তিনটি পাকঘাঁটির ওপর প্রবলভাবে আক্রমণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীকে জিলা স্কুলে অবস্থিত পাকিস্তান অবস্থান আক্রমণ করতে আদেশ দেয়া হয় । সুবেদার মোজাফরকে পুলিশলাইনে অবস্থিত পাকঘাটি আক্রমণ করতে বলা হয় এবং নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামানকে (শহিদ) ওয়ারলেস স্টেশন আক্রমণ করতে আদেশ দেয়া হয়।
মেজর ওসমান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন আনুমানিক ৭০০ বাঙালি ইপিআর সৈন্য ছিল। সহস্রাধিক আনসার, মুজাহিদ ও পুলিশ তার বাহিনীর সাথে যোগ দিল । যোগাযোগ রক্ষার জন্য পোড়াদহের খোলা মাঠে একটি একচেঞ্জের মাধ্যমে কুষ্টিয়া যুদ্ধক্ষেত্র ও চুয়াডাঙ্গা সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হলো। ডা, আসহাবুল হক ফিল্ড চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন ও প্রযোজনীয় ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করলেন।
২৮শে মার্চ কুষ্টিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি কোম্পানী ঝিনাইদহ পৌছে গেল এবং যশোর ঝিনাইদহ সড়ক অবরোধ করলো। যশোর সেনানিবাস থেকে কুষ্টিয়ার পাক ঘাঁটিতে পাকবাহিনী আসতে চাইলে তা প্রতিহত করাই ছিল এই অবরোধের উদ্দেশ্য। ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীর নির্দেশ মোতাবেক এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে চুয়াডাঙ্গা পোড়াদহ কাঁচা রাস্তা ধরে অগ্রসর হতে লাগলো। সুবেদার মোজাফফরকে তার কোম্পানীসহ ভেড়ামারা হয়ে কুষ্টিয়া শহরের উপকণ্ঠে অপেক্ষা করতে নির্দেশ দেয়া হলো। চুয়াডাঙ্গা সদর দপ্তর রক্ষা করার জন্য প্রায় ২০০ মুক্তিযোদ্ধা বিশখালিতে প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা করলো। সুবেদার মজিদ মোল্লা দুই পা নিয়ে কোর্টচাদপুরে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিলেন। কালিগঞ্জে প্রায় ২০০ মুক্তিযোদ্ধা ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিলেন। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অধ্যাপক শফিউল্লাহ (বর্তমানে লেঃ কর্ণেল) ঝিনাইদহে অবস্থান মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন।
২৯ শে মার্চ ভোর ৪টায় আক্রমণ করার কথা ছিল। গাড়ি দুর্ঘটনার জন্য সুবেদার মোজাফফরের কোম্পানী যথাসময়ে এসে না পৌছতে পারায় ৩০শে মার্চ ভোর ৪ টায়। তিন দিক থেকে পাক ঘাঁটিগুলো সংযুক্তভাবে আক্রমণ করা হয়। আক্রমণের সাথে সাথে জনগণ গগনবিদারি জয়ধ্বনি দিতে থাকে।
৩০ শে মার্চ ভোর ৪টায় প্রথম সুবেদার মোজাফফরের অধীনস্থ কোম্পানী পুলিশলাইনের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে একটি বাড়ির তিনতলা থেকে পুলিশলাইনে অবস্থানরত পাকসেনাদের উপর আক্রমণ শুরু করে। মেহেরপুর থেকে আগত এক কোম্পানী আনসার ও এক কোম্পানী মুজাহিদ এই যুদ্ধে যোগ দেয়। হাজার হাজার মানুষ আক্রমণের সাথে সাথে মুহুর্মুহু জয় বাংলা শ্লোগান দিতে থাকে। সারাদিন যুদ্ধের পর বিকাল ৫টার দিকে কুষ্টিয়া পুলিশলাইন মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে।
ক্যাপ্টেন আযম চৌদুরী তার বাহিনী নিয়ে জিলা স্কুলে অবস্থানরত পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামান (শহিদ) মোহিনী মিলের দিক থেকে অয়ারলেস স্টেশনের উপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে।
তিনদিকের যুগপৎ আক্রমণ ও গগণবিদারি জয় বাংলা শ্লোগানের ফলে পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়। আতঙ্কগ্রস্ত ঘেরাও অবস্থায় পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং দিশেহারা হয়ে পড়ে। সারাদিন যুদ্ধ চলার পর মাত্র ৪০/৪৫ জন পাকসেনা জীবিত ছিল। জীবিত পাকসেনারা জিলা স্কুলে সমবেত হওয়ার চেষ্টা করে। পালাবার সময় অনেক পাকসেনা নিহত হয়।
বিকেল নাগাদ শুধুমাত্র জিলা স্কুল ছাড়া সমস্ত শহর মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। বিজয়ের আনন্দে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল শক্তিতে জিলা স্কুল চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এবং অবিরাম আঘাত হানতে থাকে।
রাতের অন্ধকারে জীবিত পাকসেনারা ২টি জিপ ও ২টি ডজ গাড়িতে করে ঝিনাইদহের পথে পালানোর চেষ্টা করে। মুক্তিবাহিনী পলায়ননগর পাকসেনাদের শৈলকূপা সেতুর সন্নিকটে এ্যামবুশ করে। মুক্তিযোদ্ধারা শৈলকূপা সেতুটি ধ্বংস করে শূন্যস্থান বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢেকে আলকাতরা দিয়ে রং পরে পিচঢালা রাস্তার মতো করে রাখে। পলায়নরত পাকসেনাদের গাড়ি দুইটি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলে মুক্তিবাহিনী অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে। এখানে মেজর শোয়েসহ বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। অবশিষ্ট পাকসেনা আহত অবস্থায় আশেপাশের গ্রামে পালিয়ে যায়। গ্রামবাসীরা এই পাকসেনাদের পিটিয়ে হত্যা করে।
৩১শে মার্চ আহত অবস্থায় লেঃ আতাউল্লাহ শাহ ধরা পড়ে। ১লা এপ্রিল কুষ্টিয়া শত্রুমুক্ত হয়। ২রা এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় মেজর ওসমান চৌধুরী তার জবানবন্দী নেন। এই যুদ্ধে মাল ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন ও কয়েকজন আহত হন। কুষ্টিয়া বিজয়ের পরে দখল করা সকল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ চুয়াডাঙ্গা সদর দপ্তরে নিয়ে আসা হয়। তারা এপ্রিল ফরাসি টেলিভিশন কর্পোরেশনের একটি ভ্রাম্যমাণ দল চুয়াডাঙ্গা আসেন। ৩রা যুদ্ধবন্দি পাক অফিসার লে. আতাউল্লাহ শাহ-এর ছবিসহ দখলকৃত সকল অস্ত্রশস্ত্রের ছবি তোলেন। তেজোদীপ্ত যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিও তারা তোলেন এবং মেজর ওসমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এই দিনই পাকিস্তান বিমান বাহিনী চুয়াডাঙ্গায় নেপাম বোমা নিক্ষেপ করে। ফরাসি টেলিভিশন কর্পোরেশনের সদস্যরা বোমা নিক্ষেপের জীবন্ত ছবি গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে এসবই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে টেলিভিশনে দেখানো হয় এবং এই চিত্র প্রদর্শনের ফলে বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য যে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ানটি ২৭শে মার্চ লেঃ কর্নের রেজাউল জলিলের (বাঙালি) নেতৃত্বে চৌগাছায় অবস্থান করছিলেন। মেজর ওসমান চৌধুরী এই সময় দুইবার লেঃ কর্ণেল রেজাউল জলিলকে বিদ্রোহ করে তার ব্যাটালিয়ানসহ মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু লেঃ কর্ণেল রেজাউল জলিল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান না করে ২৮শে মার্চ যশোর সেনানিবাসে তার ব্যাটালিয়ান নিয়ে ফিরে যান এবং অস্ত্র জমা দেন। ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহিম দুররানী প্রথম ইস্টবেঙ্গলকে নিরস্ত্র করার এই আদেশ সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে এক তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ৩০শে মার্চ সকাল ৮টার সময় প্রথম বেঙ্গলের সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে এবং অস্ত্রাগার ভেঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ দখল করে। ৭ম ফিল্ড এম্বুলেন্সের বাঙালি সৈনিকেরাও এদের সাথে যোগ দেয়। সারাদিন ধরে যুদ্ধ চলে এবং ৩০-৪০ জন বাঙালি সৈনিক নিহত হয়। সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় লেঃ আনোয়ার শহিদ হন। লেঃ আব্দুল হাফিজ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর) অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে বীরবিক্রমে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মেজর ওসমান চৌধুরীর সাথে যোগ দেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই শোচনীয় পরাজয়ের পর কুষ্টিয়া পুনর্দখলের জন্য সচেষ্ট হয়। আকাশ ও জলপথে যশোর সেনানিবাসে ব্যাপক সৈন্য ও অস্ত্র নিয়ে আসা হয়। এই সময় পাকবাহিনীর একটি দল আরিচা থেকে জলপথে গোলালন্দের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাকবাহিনীর অপর একটি দল নগরবাড়ি ঘাটে অবতরণের চেষ্টা করে। মুক্তিবাহিনী সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করে কিন্তু সীমিত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে শেষ করা যায়নি। ১৪ই এপ্রিল নগরবাড়ি ঘাট পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। ১১ই এপ্রিল ভেড়ামারায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। কিন্তু পাকবাহিনী ভেড়ামার দখল করে নেয়। এই সময়ে মেজর ওসমান তারি সদর দপ্তর চুয়ডাঙ্গা থেকে মেহেরপুরে স্থানান্তর করেন। অবস্থার দুত অবনতি ঘটতে থাকে। মুক্তিবাহিনী মেহেরপুর থেকে ভৈরব নদীর তীরে ইছাখালী সীমান্ত এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়।
বাঙালি জাতির জীবনে ১৭ই এপ্রিল একটি ঐতিহাসিক দিন। এই দিন মেহেরপুর বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বহু দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করেন । পলাশীর আম্রকাননে একদিন যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, আবার সেই সূর্য উচিত হলো আর এক আম্রকাননে। এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে বাংলাদেশের রাজধানী ঘোষণা করে এর নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। ঐতিহাসিক কারণেই কুষ্টিয়া জেলার মুজিবনগর। স্মৃতিময় হয়ে আছে।
কুষ্টিয়া যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রাথমিক পর্যায়ে একটি বড়ো ধরনের বিজয়। এই যুদ্ধ জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ ও যানবাহন মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে । অপরদিকে পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে ভীতি ও ত্রাসের সৃষ্টি করে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে কুষ্টিয়া বিজয়ে জনগণের সাহস, আত্মবিশ্বাস, উদ্দীপনা আকাশচুম্বী রূপ নেয়। মুক্তিবাহিনী পাকসেনাদের মোকাবিলা করেছে বীরত্বের সঙ্গে। এই এলাকার সাহসী জনগণের নির্ভীক ভূমিকা যুগে যুগে জাতিকে প্রেরণা যোগাবে। ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে বিজয়ের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।

তথ্যনির্দেশ: একাত্তরের বিশটি ভয়াবহ যুদ্ধ, মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি, প্রকাশক : মনিরুল – হক, অনন্যা, ৩৮/২ বাংলাবাজার, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, পৃষ্ঠা ৫-১১
রফিকুল ইসলাম, মেজর পিএসসি, মুক্তিযোদ্ধা, কমান্ডার, সাত নং সেক্টর।

———————
তথ্যসূত্র: বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড), সম্পাদনা: বিলু কবীর, সিকদার আবুল বাশার, গতিধারা, ঢাকা, প্রকাশ কাল: সেপ্টেম্বর, ২০১৭।