কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও সাহিত্যিক

মোহাম্মদ কামরুল হুদা

কুষ্টিয়া বাংলাদেশের ছোটো জেলাগুলোর একটি। নানাকারণেই সীমান্তবর্তী এই জেলাটি বাংলাদেশের সামগ্রিকতায় একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে সঠিক চেতনার পরিচয় দান করে এই জেলা বিরাট ঐতিহ্য সৃষ্টি এবং জনমানবের এগিয়ে চলার প্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। নিঃসন্দেহে কুষ্টিয়া জেলার এই চেতনা ও প্রেরণা কোনো আকস্মিক ঘটনামাত্র নয়; এই জেলার সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্যেই সে বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
প্রাক-দেশবিভাগকালে এ জেলার কোনো পৃথক অস্তিত্ব ছিল না, আজকের কুষ্টিয়া জেলা ছিল অধুনা পশ্চিমবাংলার নদীয়ার অংশ। কিন্তু যে অংশ নিয়ে এই জেলার সৃষ্টি হয়েছে, সে অংশ সমৃদ্ধিতে, ঐতিহ্যে, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ছিল অগ্রসরমান ও উন্নত। বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসের প্রাচীন ও মধ্যযুগে এতদঞ্চলের কোনো সাহিত্যিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু আধুনিককালে বিচিত্র বিবর্তনের মধ্যে প্রথমাবধি কুষ্টিয়া জেলার সাহিত্যিকবৃন্দের কলকণ্ঠ মুখর।
সাহিত্যের ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে এ জেলার আদি সাহিত্যিক প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক ও মরমী কবি বাউল শিরোমণি লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০; জন্মস্থান কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রাম)। বাউল সাধকপন্থী এই নিরক্ষর কবি সাধনার পাদমূলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যে অমূল্য রত্নরাজি আহরণ করেছিলেন তার পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর অজস্র গানে। লালনের গান এদেশের অগণিত মানুষের জীবনাদর্শ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনার সাথে ওতপ্রাতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় দুই শতাব্দীকাল ধরে। লালন গৌরবদান করেছেন এ জেলাকে- কুষ্টিয়ার অদূরে ছেঁউড়িয়া গ্রামে লালনের মরদেহকে ধারণ করে এ জেলার মাটি ধন্য হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেলার সাহিত্যের ইতিহাসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চির-উজ্জ্বল একটি জ্যোতিষ্ক। এ জেলার বহিরাগত রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়াকে গৌরবান্বিত করেছেন, কুষ্টিয়া দিয়েছে তার কাব্য-ভাবনায় পূর্ণতা : তার সাহিত্য-জীবনকে রূপে-রসে-গন্ধে-স্পর্শে দিয়েছে ভরে। জমিদারী কার্যোপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের এখানে আগমন (১৮৯১) এবং শিলাইদহ ও কুষ্টিয়া শহরে অবস্থান তাঁর কবি-জীবনের সঠিক পথ-প্রাপ্তির উল্লাসে মুখরিত। কবি-জীবনের যৌবনের অমর ফসল ‘সোনার তরী’র মূল প্রেরণা কুষ্টিয়া দিয়ে প্রবহমান পদ্মা, ছোটগল্পের উৎসস্থল পদ্মাপাড়ের বিশাল জনপদ, কবি-জীবনের পরিণতি শিলাইদহের নিসর্গ।
কুমারখালীর হরিনাথ মজুমদার ওরফে কাঙাল হরিনাথ (১৮৩৩-১৮১৬) মরমীসাধককবি বলে সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা ‘গ্রামবার্তা’র।
প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক হরিনাথ মজুমদারের মধ্যে নানা প্রতিভার সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সম্পর্কে সুরেশচন্দ্র মৈত্র বলেছেন, ‘কাঙাল হরিনাথ নিজেই একটি Institution; সুদূর মফঃস্বলে এতবড় জাগ্রত চিত্ত তখন আর দ্বিতীয় ছিল না। তাঁর মনীষা নানাদিকে প্রকাশিত হয়েছে-সাময়িকপত্র সম্পাদনায়, বঙ্গবিদ্যালয় সংগঠনে, উপন্যাস রচনায়, ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যায়, বাউলসঙ্গীতের পুনরুজ্জীবনে এবং আধ্যাত্মিক সাধনায়।* তাঁর জীবনের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে যে, তিনি যত বড়ো না সাহিত্যিক তারও চেয়ে বড়ো বাংলাসাহিত্যের কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের সাহিত্যগুরু হিসাবে। এ সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে আবুল আহসান চৌধুরী তাঁর কুষ্টিয়ার বাউল সাধক’ গ্রন্থে বলেছেন, কাঙাল কুমারখালীতে সাহিত্যচর্চার এমন একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন, যার ফলে সেখানে বেশ কিছু সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তীকালে বাংলাসাহিত্যে এঁরা সকলেই খ্যাতিমান হন। কাঙাল হরিনাথের সাহিত্য-শিষ্যদের মধ্যে সাহিত্যিক-সাংবাদিক রায়বাহাদুর জলধর সেন, ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, মুসলিম বাংলাসাহিত্যের বিদ্যাসাগর মীর মশাররফ হোসেন, সুসাহিত্যিক দীনেন্দ্রকুমার রায়, তন্ত্রাচার্য সাধক শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব ও ‘বসুমতী’ পত্রিকার সম্পাদক দীনেশচন্দ্র রায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাঙালের সাহিত্যপ্রতিভাও বহুমুখী। উপন্যাস, নাটক, পাঁচালী, কবিতা, ইতিহাস, উপাখ্যান, সঙ্গীত (বাউলগানসহ), ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি তাঁর বহুধরনের রচনা পাওয়া যায়। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘বিজয়-বসন্ত’ উপন্যাস, কবিতা কৌমুদী’, ‘বিজয়া’, ‘সাবিত্রী’ নাটিকা, ‘কাঙাল ফিকিরচাঁদ ফকিরের গীতাবলী’, ‘অধ্যাত্ম আগমনী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
হরিনাথ মজুমদারের সাহিত্য-শিষ্য মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ছিলেন বাংলার মুসলিম সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ। কুষ্টিয়ার অদূরে গড়াইনদীর তীরে লাহিনীপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সমাজ ও মানবচরিত্র-সচেতন মীর মশাররফ হোসেনও ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাশালী সাহিত্যিক। তাঁর গদ্যরচনা, উপন্যাস, কাব্য, নাটক, রসরচনা, প্রহসন, সঙ্গীত, ধর্মসঙ্গীত, জীবনীকাব্য ইত্যাদি গ্রন্থ-তাঁকে বাঙলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের মর্যাদা দান করেছে। সমকালীন মুসলিম লেখকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেনই সর্বপ্রথম সাহিত্যের আধুনিকতার সুরটি ধরতে পেরেছিলেন। “বিষাদসিন্ধু’ (যা তাঁর সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় গ্রন্থ) তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘বিষাদসিন্ধু’সহ “গাজী মিঞার বস্তানী’, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’, ‘জমীদার দর্পণ’ ছাড়াও গদ্যেপদ্যে পঁয়ত্রিশখানারও অধিক গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। এ জেলার আর একজন প্রখ্যাত কবি মুন্সী দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬) পোড়াদহের অদূরে আটিগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙ্গাপ্রাণ’ ও ‘আশেকে রসুল’। এছাড়াও তাঁর ‘শান্তিকুঞ্জ’ ও ‘সমাজশিক্ষা’ নামে দু খানা কবিতার বই রয়েছে।
বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী ‘হিমালয়’ গ্রন্থের রচয়িতা সাময়িকপত্ৰসেবী রায়বাহাদুর জলধর সেন (১৮৬০-১৯৩৯) কুষ্টিয়া জেলার অপর একজন যশস্বী সাহিত্যিক। ‘হিমালয়’ ছাড়াও তিনি প্রবাসচিত্র’, ‘পথিক’, ‘হিমালয়বক্ষে’, ‘হিমাদ্রি’ প্রভৃতি ভ্রমণকাহিনী এবং ১২ খানা গল্প ও জনপ্রিয় উপন্যাস “বিশুদাদা’সহ প্রায় ১৮ খানা উপন্যাস রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (১৮৬২-১৯৩০) : বাঙালীর নিজদেশের ইতিহাস চেতনার উন্মেষকালে ঐতিহাসিক চিত্র’ নামক ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলাদেশের নবাবী আমলের সত্য ইতিহাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এবং এক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যও অসামান্য। সিরাজদ্দৌলা’ ও ‘মীর কাশিম তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও খ্যাতিসম্পন্ন গ্রন্থ। তার অপর আর একখানি গ্রন্থ “ফিরিঙ্গি বণিক’। দীনেন্দ্রকুমার রায় (১৮৬৯-১৯৪৩) মেহেরপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ইংরাজী অনুবাদ অনুসরণ করে তিনি অসংখ্য রোমান্টিক ও ডিটেকটিভ কাহিনী রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর ‘পল্লীচিত্র বাংলাসাহিত্যের একখানি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এছাড়াও ‘পল্লীবৈচিত্র্য’, ‘পল্লীকথা’ ইত্যাদিও উপভোগ্য রচনা।
মেহেরপুর মহকুমার গাঁড়াডোব গ্রামের মুন্সী মোহাম্মদ জমিরুদ্দিন (১৮৭০-১৯৩০) ইসলাম ধর্ম প্রচারক হিসাবে সমধিক পরিচিত। বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক মুন্সী মেহেরুল্লাহর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর হিসাবে তিনি খ্রীষ্টান মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত হন। ইসলামের মাহাত্ম ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন এবং ইসলাম ধর্মের নীতি ও আদর্শ প্রচারের মানসে তিনি কয়েকখানি গ্রন্থ রচনা করেন। রদ্দে খ্রীষ্টান, ইসলামী বক্তৃতা’, ‘শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মোহাম্মদ (দঃ) ও পাত্রীর ধোকাভঞ্জন’, ‘শোকানল’ (কবিতার বই) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
কুষ্টিয়া জেলার এই সময়কার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে রয়েছেন প্রফুল্লকুমার সরকার, জগদীশ গুপ্ত, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৫-১৮৮৬) : জন্ম : গোস্বামী দুর্গাপুর : গ্রন্থ : যৌবনোদানে : “মিত্রবিলাস, কায্যকলাপ’, রাজবালা, মেঘদূত’, নানা প্রবন্ধ, Hindu Philosophy ইত্যাদি। রমণীমোহন মল্লিক, কবি গোপীবল্লভ বিশ্বাস, প্রখ্যাত দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৮৮-১৯৫২;) গ্রন্থ : কাব্যবিচার’, সৌন্দর্যতত্ত্ব’, ‘দার্শনিক, রবি-দীপিতা’, A Study of Patanjali ইত্যাদি), কবি হরিপদ গঙ্গোপাধ্যায়, কুষ্টিয়া কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ গোপীপদ চট্টোপাধ্যায় (গ্রন্থ : ‘উৎসব’ (নাটিকা), মুক্তিপথে’ (নাটিকা), তন্ত্রাচার্য শিচন্দ্র বিদ্যার্ণব (গ্রন্থ : তন্ত্রতত্ত্ব’, ‘রাসলীলা’, মা ‘পাঠমালা’, ‘গীতাঞ্জলি ইত্যাদি), ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার, সরোজ আচার্য, শচীন্দ্রনাথ অধিকারী (গ্রন্থ : ‘পল্লীর মানুষ রবীন্দ্রনাথ, ‘সহজ মানুষ রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি), ডঃ হরগোপাল বিশ্বাস, আবদুল হামিদ কাব্যবিনোদ প্রভৃতি।
বাউল-গবেষক ও রবীন্দ্রসাহিত্যে সুপণ্ডিত বিশিষ্ট সাহিত্যসমালোচক ডঃ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (১৮৮৯-১৯৭০) কুষ্টিয়ার হরিণারায়ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রকাব্য-পরিক্রমা, রবীন্দ্রনাট্য পরিক্রমা’, বাংলার বাউল ও বাউল গান’ প্রভৃতি তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় গ্রন্থ।
গোলাম কুদ্দুস ও আজিজুর রহমান এ জেলার দু’জন খ্যাতিমান কবি। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে রচিত কবিতারাজী গোলাম কুদ্দুসকে উভয় বাংলার জনপ্রিয় কবি হিসাবে পরিচিত করেছে। আজিজুর রহমান গীতিকার হিসাবে অধিক পরিচিত। এছাড়াও ফয়েজউদ্দীন আহমেদ ও মোয়াজ্জেম হোসেন (গ্রন্থ : ‘জিন্দেগী’), অপর দু’জন উল্লেখযোগ্য কবি।
প্রবীনরা ছাড়াও এ জেলার নবীন কবিরাও বাংলা কাব্যসাহিত্যে বিশিষ্ট অবদান রেখেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন আবু জাফর (জন্ম ১৯৪৩; কাব্য : ‘নতুন রাত্রি পুরানো দিন’, ‘বাজারে দুর্নাম তবু তুমিই সর্বস্ব’, ‘বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত কবিতা’), আবুল আহসান চৌধুরী (জন্ম ১৯৫৩, কাব্য : ‘স্বদেশ আমার বাঙলা’, নীলকণ্ঠ জীবন তুমি’), ধীর আলী তালুকদার (জন্ম ১৯৩৫ : কাব্য : খসম খাকীর খাল), মিনু আহমেদ (কাব্য : ‘সুবর্ণ জোয়ারের দিন’)। আবদুর রশীদ চৌধুরী (জন্ম ১৯৪৫ ; কাব্য-“নির্জনে আমি একা’)।
উপন্যাস রচনায় কুষ্টিয়ার সাহিত্যিকদের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন (১৯১৬-১৯৮১) বাংলাসাহিত্যের উপন্যাস-ধারায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর বহুখ্যাত গ্রন্থ “কি পাইনি”, “মোহমুক্তি’ ও ‘অবাঞ্ছিত’সহ তিনি বেশ কয়েকখানি সুখপাট্য উপন্যাসের রচয়িতা। আকবর হোসেন ছাড়াও কুমারেশ ঘোষ, জোবেদা খানম, নাজমূল আলম, মজিবর রহমান, বেগম নূরজাহান এ জেলার উল্লেখযোগ্য কথাশিল্পী। হিরোশীমার ডাইরী’ রচয়িতা মহম্মদ সিরাজউদ্দিনের নামও এখানে স্মরণীয়।
নাট্যসাহিত্যে সমৃদ্ধ কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের নাট্যান্দোলনের পুরোভাগে রয়েছে। এখানকার বিভিন্ন নাট্যসংস্থা, শক্তিশালী অভিনেতা, অভিজ্ঞ নাট্য-পরিচালক ও প্রতিভাধর নাট্যকারগণ বাংলাদেশের নাটকের ক্ষেত্রকে বহুদূর সম্প্রসারিত করেছেন। এখানকার নাট্যকারদের মধ্যে সর্বপ্রথম মুহম্মদ নেজামতুল্লাহর নাম স্মরণীয়। একজন প্রতিভাবান অভিনেতা হিসাবে যেমন তিনি বাংলাদেশের নাট্যামোদীদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তেমনি তাঁর রচিত ‘শহীদ সেরাজ’ নাটকখানি জনপ্রিয়তা লাভ করতে সমর্থ হয়। এখানকার নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে মুহম্মদ আবদুল লতীফ (১৯১৭) আর একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁর রচিত সামাজিক নাটক ‘প্রতিশোধ’, ‘রাত্রিশেষ’, ‘ঝড়ের শেষে’, মঞ্চসফল নাটক হিসাবে সর্বজন প্রশংসিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ধারাবাহ্যিকভাবে প্রচারিত ‘জল্লাদের দরবার নাটকের রচয়িতা বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার শ্রী কল্যাণ মিত্র কুয়াশাকান্না’, ‘দায়ী কে’, ‘পাথরবাড়ী’, ‘সূর্যমহল’, ‘সাগরসেঁচা মানিক’, ‘টাকা-আনা-পাইসহ পঁয়ত্রিশ খানা সার্থক নাটক রচনা করেছেন। কুষ্টিয়ার আর একজন শক্তিমান অভিনেতা ও দক্ষ নাট্য পরিচালক অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরী নতুন আঙ্গিকে নাটক রচনা করে সুধীজনের প্রশংসা অর্জন করেছেন। তার রচিত ‘মরুর কান্না, (ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চস্থ), ‘বৃত্ত বৃত্ত বৃত্ত’, (ঢাকা বেতার থেকে প্রচারিত) ও মৃত নক্ষত্র নাটকত্রয় বাংলা নাটকের ধারায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এখানকার অন্যান্য নাট্যকারদের মধ্যে রয়েছেন মুনছুরুল আলম (নাটক : রক্তে ভেজা মাটি’), মসলেম উদ্দিন আহমদ (নাটক: কাজীবাড়ীর বৌ), কাজী রশিদুল হক পাশা (অভিযাত্রী), আকছারুল ইসলাম (প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ ইত্যাদি), জিল্লুর রহমান ময়না (মন যারে চায়)।
বাংলাসাহিত্যের অন্যতম খ্যাতনামা শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই) এবং আতোয়ার রহমান কুষ্টিয়ার সাহিত্যের ইতিহাসকে গৌরবাম্বিত করেছেন।
কুষ্টিয়া জেলায় সাহিত্য ধারার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে প্রবন্ধ। প্রবন্ধকার এবং গবেষণামূলক রচনার জন্য এখানকার প্রবীণ ও তরুণ সাহিত্যিকগণ পণ্ডিতজনের প্রশংসা লাভ করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন এএইচএম ইমামউদ্দিন (গ্রন্থ: বাউল মতবাদ ও ইসলাম). ড: এএসএম আনোয়ারুল করীম (গ্রন্থ: বাউল কবি লালন শাহ, বাউল সাহিত্য ও বাউল গান, বাংলাসাহিত্যে মুসলিম কবি ও সাহিত্যিক, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ), আবুল আহসান চৌধুরী (গ্রন্থ: কুষ্টিয়ার বাউলসাধক, সংক্ষিপ্ত কুষ্টিয়া পরিচিতি, লালন স্মারকগ্রন্থ, সঙ্গীত লহরী, সম্পাদিত, কুষ্টিয়া: ইতিহাস-ঐতিহ্য –সম্পদিত) ইত্যাদি।
কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও সাহিত্যিক বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের অবিচ্ছিন্ন অংশ। বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি, নিসর্গ এবং মানুষের ধ্যান-ধারণা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, মিলন-বিরহের গান এখানকার সাহিত্যিকদের রচনায় শতধারে উৎসারিত। বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসের ধারায় তাই কুষ্টিয়ার সাহিত্যিকদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

————————————————-
*উদ্ধৃতিটি আবুল আহসান চৌধুরীর কুষ্টিয়ার বাউল সাধক’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত।

তথ্যনির্দেশ:
কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরী প্লাটিনাম জুবিলী স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদক: অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী, প্রকাশ: কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরী, ২৯ ডিসেম্বর ১৯৮৫, পৃষ্ঠা ৫৬-৬২।
মোহাম্মদ কামরুল হুদা, কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক বাংলাবিভাগ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।
——————————————————

তথ্যসূত্র: বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড), সম্পাদনা: বিলু কবীর, সিকদার আবুল বাশার, গতিধারা, ঢাকা, প্রকাশ কাল: সেপ্টেম্বর, ২০১৭।