ক্রমিক

নাম

ইতিহাস

কিভাবে যাওয়া যায়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ী অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুর শিলাইদহ জমিদারী ক্রয় করে ১৮১৩ সালে তিনি কুঠিবাড়িটি নির্মাণ করেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ, জ্যোতিবিন্দ্র নাথ, হেমেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ ঠাকুর বংশের প্রায় সকলেই পদ্মা গড়াই বিধৌত এখানে বসবাস করেন। মূলত: জমিদারী কাজকর্ম দেখাশুনার জন্য এই বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। সে সময়ে ঠাকুর পরিবারে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ; নাটোরের পতিসর ও পাবনার শাহজাদপুরে তিনটি জমিদারী ছিল। পারিবারিক আদেশে রবীন্দ্রনাথকে শিলাইদহে জমিদারী পরিচালনার জন্য এসেছিলেন। কুষ্টিয়া শহর হতে রবীন্দ্রনাথ এর কুটি বাড়ির দূরুত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। কুষ্টিয়া শহর হতে অটো রিক্সা, সিএনজি ও ইজি বাইক ও অন্যান্য বাহন যোগে সহজেই এবং খুবই কম খরচে শিলাইদহ কুটি বাড়ি যাওয়া যায়।
বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার আধ্যাত্মিক সাধক লালন শাহ’র কুমারখালীর ছেঁউড়িয়াতে আশ্রয় লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে ছেঁউড়িয়াতে মৃত্যুর পর তাঁর সমাধি স্থলেই এক মিলন ক্ষেত্র (আখড়া) গড়ে ওঠে। ফকির লালন শাহের শিষ্য এবং দেশ বিদেশের অগনিত বাউলকুল এই আখড়াতেই বিশেষ তিথিতে সমবেত হয়ে উৎসবে মেতে উঠে। এই মরমী লোককবি নিরক্ষর হয়েও অসংখ্য লোক সংগীত রচনা করেছেন। বাউল দর্শন এখন কেবল দেশে নয়, বিদেশের ভাবুকদেরও কৌতুহলের উদ্রেক করেছে। ১৯৬৩ সালে সেখানে তার বর্তমান মাজারটি নির্মাণ করা হয় এবং তা উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খান। ২০০৪ সালে সেখানেই আধুনিক মানের অডিটোরিয়ামসহ একাডেমি ভবন নির্মাণ করা হয়। কুষ্টিয়া বাস স্ট্যান্ড হতে রিক্সা/অটোরিক্সাযোগে ছেউরিয়া নামক স্থানে, ভাড়া ৩০-৫০/-। কুষ্টিয়া বড় রেলস্টেশন হতে বাস স্ট্যান্ড হতে রিক্সা/অটোরিক্সাযোগে ছেউরিয়া নামক স্থানে, ভাড়া ২০-৩০/-।
টেগর লজ ১৮৯৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকে ব্যবসার সাথে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি ও তার দুই ভাগ্নে সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথ এর সহায়তায় শিলাইদহে টেগোর এন্ড কোম্পানীগড়ে তোলেন যৌথ মুলধনী ব্যবসা। সে বছরই ব্যবসায়িক সুবিধার্থে টেগোর এন্ড কোম্পানী শিলাইদহ থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরিত করেন। কোম্পানী দেখাশুনার জন্য কবি শহরের মিলপাড়ায় একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করেন। এখানে বসে কবি অসংখ্য কবিতা লিখেন যা পরবর্তিকালে ‘‘ক্ষণিকা’’, কথা ও কাহিনীতে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে এ ভবনটিও একটি দর্শনীয় স্থান।  
জগতি রেলওয়ে স্টেশন রেলওয়ের ঐতিহ্য জগতি স্টেশন রেলের ইতিহাসে কালের সাক্ষী হয়ে আছে কুষ্টিয়ার জগতি স্টেশন। এটিই এদেশের প্রথম রেল স্টেশন। ব্রিটিশ আমলে কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাতায়াতে ১৮৬২ সালে এ স্টেশনটি চালু করা হয়। ১৮৪৪ সালে আর. এম স্টিফেনসন কলকাতার কাছে হাওড়া থেকে পশ্চিম বাংলার কয়লাখনি সমৃদ্ধ রানীগঞ্জ শহর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি গঠন করেন। এ কোম্পানি ১৮৫৪ সালে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রেললাইন চালু করে। এরপর ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত রেলপথ চালু করে। এই লাইনকেই বর্ধিত করে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন শাখা উন্মোচন করা হয়। সে সময়ই প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ববঙ্গের প্রথম রেলওয়ে স্টেশন জগতি। পরে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি জগতি থেকে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পদ্মানদী তীরবর্তী গোয়ালন্দঘাট পর্যন্ত রেললাইন চালু করা হয়। সে সময় মানুষ কলকাতা থেকে ট্রেন করে জগতি স্টেশন হয়ে গোয়ালন্দঘাটে যেতেন। সেখান থেকে স্টিমারে পদ্মানদী পেরিয়ে চলে যেতেন ঢাকায়। কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে দেশের সেই প্রথম রেলওয়ে স্টেশন জগতি।  
গোপীনাথ জিউর মন্দির কুষ্টিয়া শহরে ১৯০০ সালে যশোর জেলার নলডাঙ্গার মহারাজা প্রমথ ভূষণ দেবরায় কর্তৃক দানকৃত জমির উপর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চাঁদার টাকায় এ মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। ১৯০৫ সালে মহারাজা প্রমথ ভূষণ দেব তার স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষার্থে বর্তমান রথখোলা গোপীনাথ জিওর মন্দির ও রথের মেলা প্রচলন করেন। ১৯১৩ সালে ধনী ব্যবসায়ী মাখন রায় অপূর্ব কারুকার্য খচিত বিরাট আকৃতির একটি পিতলের রথ নির্মাণ করে দেন যা সমগ্র ভারতবর্ষের একমাত্র রথ ছিল।  
মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তভিটা বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্ত্তভিটা কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়ায় অবস্থিত। এখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছোট আকারের একটি লাইব্রেরী আছে। সম্প্রতি ১৭ অক্টোবর ২০০৮ সালে মীর মশাররফ হোসেনের নামে স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থায়নে ৫৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদ কুষ্টিয়া কর্তৃক বাস্তবায়নের জন্য একটি লাইব্রেরী ও অডিটরিয়াম এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব জনাব আলী ইমাম মজুমদার।  
ঝাউদিয়ার শাহী মসজিদ কুষ্টিয়া সদর থানার অর্ন্তগত ঝাউদিয়া গ্রামে শাহী মসজিদ মোঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে ঝাউদিয়ার জমিদার শাহ সূফী আহমদ আলী ওরফে আদারী মিয়া নির্মাণ করেন। এটি মোঘল শিল্পকলার এক অপূর্ব নিদর্শন। মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং এর চার কোনায় চারটি বড় মিনার আছে। ১৯৮০ সাল থেকে প্রত্নতত্ব বিভাগ এটি সংরক্ষণ করে আসছে।  
কুষ্টিয়া পৌরভবন ১৮৬৯ সালে কুষ্টিয়া পৌরসভা গঠিত হয়। কুষ্টিয়ার বিখ্যাত নীলকর টি. আই কেনী নীল ব্যবসার স্বার্থে এ শহরে একটি বিশাল ভবন নির্মাণ করেন। ২১০ একরের উপর নির্মিত এ ভবনের কক্ষ ছিল ৫০টি যা ক্রিসেন্ট বিল্ডিং নামে পরিচিত ছিল। এখানেই নব গঠিত কুষ্টিয়া মহকুমা দপ্তর, কোর্ট ও মিউনিসিপ্যাল দপ্তর গড়ে উঠে। তবে বর্তমানে ভবনটি জরাজীর্ণ। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে এ শহরের এক বিত্তবান জমিদার সতীশ শাহর বাড়ীতেবর্তমান পৌরভবনটি স্থানান্তর করা হয়।  
মোহিনী মিল সচল অবস্থায় মোহিনী মিল সমগ্র এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাপড়ের কলের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মিল। কুষ্টিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তিত্ত্ব মোহিনী মোহন চক্রবর্তী ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়া মোহিনী মিলস এন্ড কোম্পানী লিমিটেড নামে এই কাপড়ের মিলটি প্রতিষ্ঠা করেন। সমসাময়িক কালে অন্যান্য বস্ত্র কলের তুলনায় এই মিলের উৎপাদন অনেক বেশী মানসম্পন্ন ছিল বলে কালক্রমে এটি দেশের অন্যতম সেরা কাপড়ের মিলে পরিণত হয়।সচল অবস্থায় মোহিনী মিল সমগ্র এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাপড়ের কলের স্বীকৃতি লাভ করে।মাত্র ৮টি তাঁত নিয়ে মিলটি উৎপাদন শুরু করে। পরবর্তীতে মোহিনী মিল ব্যপ্তি লাভ করে। এর শ্রমিক সংখ্যা প্রায় তিন হাজারে উন্নীত হয়। মোহিনী মিলের শাড়ি ও ধুতী বাংলায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। কুষ্টিয়া শহর থেকে রিক্সাযোগে যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ১৫ মিনিট। 
১০ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ব্রিটিশ আমলে কুষ্টিয়ার সাথে কলকাতার রেল যোগাযোগ ছিল। ১৯০৯ সালে পদ্মা নদীর উপর ভেড়ামারা-পাকশি রেল সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯১৫ সালে শেষ হয়। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ব্রিজটি লম্বায় এক কিলোমিটার এবং এতে ১৮টি স্প্যান আছে। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহতম রেল সেতু। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর বোমার আঘাতে এর দুটি স্প্যান নষ্ট হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে পুনরায় তা মেরামত করা হয়। বর্তমানে এর পাশেই লালন শাহ্ সেতুর অবস্থান।
১১ স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ :
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্য লেখক: রবিউল হুসাইন
১৯৯৯-২০০০ সালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধের নক্সা ও সেইমতো নির্মাণের জন্যে দেশের বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ও আমাকে কর্তৃপক্ষ মনোনীত করে। এই উদ্দেশ্যে হাশেম খানকে আহবায়ক করে একটি উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন করা হয় এবং আমরা দু’জন সেটির কার্যকারী সদস্য হিসেবে যোগদান করি। আমি যেহেতু স্থপতি, তাই আমার উপর স্মৃতিসৌধের স্থাপত্যনকশা, নির্মাণকাঠামো নকশা, নির্মাণকালীন তদারকি ও নিসর্গ পর্রিকল্পনার দায়িত্ব পড়ে এবং সেই অনুযায়ী কাজ-শুরু করি। শিল্পী হাশেম খানের উপর সৌধের নিচে অর্ধবৃত্তাকার মঞ্চের দুই পাশে দুটি দেয়ালে পোড়ামাটির চিত্রাবলী-যেগুলো বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন ও তৎপরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে চূড়ান্ত বিজয়ের নানান বীরত্বগাথার ঘটনাবলী নিয়ে বিধৃত হবে তার সঠিক রুপায়নের ভার ন্যস্ত হয়। মুনতাসীর মামুনের উপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী, পরবর্তী ও বর্তমান- অবস্থার ইতিহাস এবং প্রেক্ষিত রচনা, যেটা অনুসরিত হবে দেয়ালচিত্রে, তার দায়িত্ব অর্পিত হয়। এ-ছাড়া স্থাপত্য সৌধ নকশার মধ্যে যে-মূল ভাবনা ও দর্শন উপস্থাপিত হবে যেগুলো সবার সঙ্গে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে পরিচিহ্নিত ও প্রতিবিম্বিত করে চুড়ান্ত রূপ নেবে- এইসব তখনই নির্ধারিত-হয় এবং সেই লক্ষ্যে সব বাস্তবায়িত হতে শুরূ করে। এই প্রসঙ্গে তদানীন্তন মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক কায়েস, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইব্রাহীম, বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আলাউদ্দিন এবং অন্যান্য সম্মানিত শিক্ষক ও ছাত্রবৃন্দের অমূল্য অবদান, পরামর্শ ও সহযোগিতার কথা-কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে হয়। কেননা তাদের নীরব ও সরব সমর্থন ছাড়া এই স্মৃতিসৌধের বাস্তব রূপ দেয়া কখনো সম্ভব হতো না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীনকাল থেকে এদেশের জনগণের মধ্যে প্রবাহিত ধারাবাহিক উন্নত বাংলা সংস্কৃতি ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত। পরবর্তীকালে বিভিন্ন আন্দোলন পরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তবে এদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বছর আর ১৯৫২ হচ্ছে ভাষা ও শহিদ দিবসের বছর। তদানীন্তন পাকিস্তান কর্তৃক বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের মাধ্যমেই ৫২ এর ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে এবং ধীরে ধীরে সুদীর্ঘ ১৯ বছর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য নেতৃত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম অবদানে ৩০ লক্ষ নাম-না-জানা নিরীহ অকুতোভয় বীর মানুষের অকাতরে প্রাণ বিসর্জন এবং ২ লক্ষ নিষ্পাপ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে স্বাধীনতা আন্দোলন চূড়ান্ত সফলতা পেয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের এইসব অপবিহার্য অংশের ইংরেজি-সন স্মরণে বিভিন্ন কাঠামো ও গঠনের উচ্চতাসহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তাবিত শহিদস্মৃতিসৌধের মূল স্থাপনার বিন্যাস করা হয়েছে। ধারণাটি ছিল এরকম : বাংলাদেশের ভাষা ও স্বাধীনতার স্মরণে প্রতিটি প্রতীক-স্তম্ভ ইট বা সিমেন্ট দ্বারা নির্মিত হবে যা মূলত বিভিন্ন মৌলিক, সনাতন ও প্রতিষ্ঠিত জ্যামিতিক আকার অর্থাৎ বৃত্ত, ব্যাসার্ধ, আয়ত ও বর্গাকার নিয়ে সৃষ্টি করা। এর মূল বিষয় ও উদ্দেশ্য বাংলাদেশের ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলন, গণযুদ্ধ এবং উদ্ভূত বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও বস্তুর পারস্পরিক যোগসূত্র নির্ণয়সহ একটি গ্রহণযোগ্য প্রতীক আবিষ্কার এবং সেইমতো যথাযথ দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনাসহ অন্তর্নিহিত মূল্য নিরূপণ ও মূল্যায়ন করা। ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের উৎস থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা-বিকাশ শুরু হয় যেখানে বাংলা সংস্কৃতি, বাংলার ভাষা এবং বাংলার স্বাধীনতা-এই তিনটি মূলমন্ত্র এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীকার লাভের ক্রমান্তর কার্যক্রম চুড়ান্ত রূপ পায়।
১৯৫২ সালের বাংলাভাষা আন্দোলন সেই থেকে উৎসারিত পরিশষে স্বাধীনতা লাভের মূলধারা এবং অতীতের বিভিন্ন প্রস্তÍতিমূলক ঘটনার ব্যাখ্যা স্মরণ করে যথাক্রমে ৩০ ফুট, ৪২ফুট ও ৫২ ফুট উচ্চতায় ২ ফুট ৬ ইঞ্চি পুরু বিভিন্ন দৈর্ঘ্যরে যেমন ১৫ ফুট, ১০ ফুট এবং ৫ ফুট বিশিষ্ট ইটের স্তম্ভ এবং দেয়ালের সংমিশ্রণে এই স্মৃতিস্তম্ভটির রূপায়ণ করা হয়েছে।
প্রত্যেকটি দেয়াল এক প্রান্ত থেকে আরম্ভ করে অন্য প্রান্তে উপরের দিকে অর্ধবৃত্তাকার খিলানরূপ মিলিত হয়ে একটির ভিতর অপরটি ক্রমান্তর উচ্চতায় ও আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে, যা ১৯৫২ সনের মূল চেতনায় পোঁছুতে অতীতের ভাষাগত ও সংস্কৃতিক জিজ্ঞাসাসহ বিভিন্ন স্তরের প্রতীক এবং তা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার বীজ হিসাবে আমাদের চেতনায় স্থায়ী আসন লাভ করেছে। সবচেয়ে উপরে অর্ধবৃত্তাকার খিলান উদীয়মান স্বাধীনতার সূর্য ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার আংশিক প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন উচ্চতাবিশিষ্ট স্তম্ভের মাঝখানে দুই পাশ উপর এবং নিচ থেকে সন্নিবেশিত। প্রতিটি স্তম্ভ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতাবিশিষ্ট ইটের চত্বরে এই স্তম্ভটি স্থাপন করা হয়েছে যার উপর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার মঞ্চ, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের বেদী, মাঝখানে ২১ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট জাতীয় পতাকার দÐ এবং দুই পাশে ১০ ফুট উচ্চতার ৩৮ ফুট ৬ ইঞ্চি দৈর্ঘের দুটি দেয়াল বাংলাভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতাবিষয়ক দেয়ালচিত্র সন্নিবেশিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের গৃহনির্মাণসামগ্রীর মধ্যে আগুনে-পোড়া ইট সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এবং এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসাবে বিবেচিত, তাই এই ইট দিয়েই স্তম্ভেও পরিকল্পনা করা হয়েছে, যদিও কাঠামোগত কারণে ভিতরে কংক্রিট থাকবে। এছাড়া গোলাকার জ্যামিতিক বৃত্ত, ব্যাসার্ধ, স্তম্ভ, খিলান ইত্যাদি স্থাপত্য-উপকরণসমূহ ইসলামী স্থাপত্যের ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেবে যা বিশ^বিদ্যালয়েরনামের সঙ্গে সাযুজ্য আনতে সাহায্য করে।
নিচের দিকে বিভিন্ন উচ্চতায় সন্নিবেশিত পারস্পরিক দেয়ালগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার প্রস্তুতিপর্বের প্রতীকে প্রতীকায়িত। চূড়ান্ত রুপ পাওয়ার জন্য তখন থেকেই জনগণের চেষ্টা ও আকাঙ্কা ছিল যা প্রতিটি যৌগিক দেয়ালের মধ্যবর্তী স্থানে অর্ধবৃত্তআর রুপে উঁচু হয়ে বারবার উদ্ভাসিত হওয়ায় প্রতীক পরিচিহ্নিত করা হয়েছে।এই স্তম্ভের বিমূর্ত ও নিরাবয়ব রুপ যৌগিক ও পরস্পর পরস্পরের আকার এবং গঠনের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। দিনের বেলায় সূর্যের আলোতে স্ত¢ম্ভে যেমন আলো-ছায়া খেলা করবে, তেমনি রাতের বেলায় বৈদ্যুতিক আলোতে আলোকোজ্জ্বল করার ব্যবস্থাও থাকবে। বিশ^বিদ্যালয়ের এই সৌধটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পমূল্য ও কার্যকারণ সবসময় প্রকাশ করবে। স্থাপত্যকীর্তি, বলা হয় তা চিরন্তন সত্য, কালের প্রকোপে এর বিপরীতে যুগ যুগ ধরে অবস্থান করে। নির্মাণসামগ্রী-পাথর-ইট-লোহা মানুষের আয়ুর চেয়ে অধিককালটিকে থাকে, তাই তারা স্থাপত্যনির্মিতির পৃষ্ঠপোষকতা করে। আমি স্থপতি হিসেবে এই স্মৃতিসৌধের নকশা করার দায়িত্ব পাওয়াকে খুব সৌভাগ্য বলে মনে করি। আমার পৈতৃক নিবাস বিশ^বিদ্যালয় চত্বর থেকে পূবদিকে দুই/ তিন মাইল দূরে মৃত কালীনদীর পাড়ে রতিডাঙ্গা গ্রামে, অপরপাড়ে বসন্তপুর গ্রাম, থানা ও মহকুমা শৈলকুপা এবং জেলা ঝিনাইদহ। যদিও আমরা কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ায় বসবাস করি, যেখানে বংশের বাতি দেয়া এক বোন ছাড়া কেউ থাকে না, যেহেতু আমিসহ অন্যান্য ভাই-বোন তাদের পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকি। এরকম এক শরণার্থী পর্যায়ে আমার ঢাকাবাসী প্রায় সবারই ছিন্নমূল তথাকথিত নাগরিক দুরবস্থায় কালাতিপাত। তার মধ্যে দেশে এক স্থাপত্যনকশার দায়িত্ব পাওয়া অবশ্যই আনন্দময় অভিজ্ঞতা। সেই কারণে খুব মনপ্রাণ দিয়ে নক্সাটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছি এবং তার মূল ভাবনাটি প্রাগুক্ত বর্ণনার মধ্যে পাওয়া যাবে। এরকম নকশা করার দায়িত্ব আমি অনেক পেয়েছি এবং যেগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পীলখানা, ঢাকা, সৈয়দপুর সেনানিবাস, চট্টগ্রাম নেভি-সদর দপ্তর, সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রামের ভেটেরিনারি বিশ^বিদ্যালয়-এইসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা স্মৃতিসৈাধমালা। এগুলোর মধ্যে ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের সৌধটি খুব গুরুত্ব বহন করে। তবে মনে হয় এটি যেরকমভাবে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয় না, হয়তো নকশাটি সবার কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি তাই। তবুও স্বাধীনতা দিবসে, আন্তর্জাতিক ভাষা বা অন্যান্য জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিবসে এই সৌধের প্রচার হওয়া দরকার, পোস্টারে, কার্ডে, বিশ^বিদ্যালয় বর্ষপঞ্জীতে, প্রতিষ্ঠা দিবস ইত্যাদিতে যেমনটি অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ে লক্ষ্য করা যায়। আশা করি কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে লক্ষ্য রাখবে এবং অনুগ্রপূর্বক যতœবান হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

তথ্যসূত্র: গদ্যমঙ্গল, সম্পাদনা: মতিউল আহসান, মিজান সরকার ও বিলু কবীর, প্রকাশক: সাহিত্য একাডেমি, কুষ্টিয়া, প্রকাশ কাল: ১৭ এপ্রিল, ২০১৩।