বাংলাদেশের মতই কুষ্টিয়ার নদ-নদীর বিচিত্র গতি প্রকৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ জেলার উপর দিয়ে বিভিন্ন সময়ে গঙ্গা নদীর প্রধান স্রোতধারা পদ্মা-গড়াই-কুমার-মাথাভাঙ্গা-ভৈরব প্রভৃতি নদ-নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পদ্মা বাদে উপরোক্ত অধিকাংশ নদ-নদীরই উৎস মুখ কুষ্টিয়ায় বা কুষ্টিয়া জেলার সন্নিকটে। ‘কুষ্টিয়া-নদী’ তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পদ্মা ও গড়াই বাদে উপরোক্ত নদ-নদী এবং তাদের অসংখ্য শাখা প্রশাখা বর্তমানে মৃত অথবা মরনোন্মুখ। এসব কারণে এই সব নদ-নদীর ইতিহাস অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক। কুষ্টিয়া জেলা প্রকৃতপক্ষে নদ-নদীরই সৃষ্টি। কুষ্টিয়ার ইতিহাসও তাই নদ-নদীরই ইতিহাসের সংগে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত।

গঙ্গা বা পদ্মা নদী: পদ্মা গঙ্গার প্রধান স্রোত বহনকারী বাংলাদেশের এক দুরন্ত ও প্রমত্তা নদীরূপে বিখ্যাত। তার এই দুরÍ স্বভাবের জন্য তাকে বলা কীর্তিনাশা। গঙ্গার প্রধান ধারা প্রাচীন গৌড় নগরীর প্রায় পঁচিশ মাইল দক্ষিরেন বিভক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী আর বাংলাদেশের পদ্মা নামে প্রবাহিত। তাই পদ্মাকে বলা বড় গঙ্গা আর বাগীরথীকে বলা হয় ছোট গঙ্গা। রাজশাহীর নিকট পদ্মা প্রথম বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

দশম শতাব্দীতে দক্ষিণ বাংলার এক কবি ভুসুকু চর্যাপদে (৪৯ নং পদ) পদ্মা নদীকে ‘পঁউর খাল’ বলে অভিহিত করেন। তখন হয়তো পদ্মা নদী হয়ে উঠেনি অথবা খালের আকার প্রাপ্ত হয়েছিল। ভ্রমণকারী ইবনে বতুতা (১৩৪৫, ৪৬), আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ (১৫৯৬-৯৭), চন্দ্রদ্বীপ হরিকেলের শাসনকর্তা মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্রের ইলিদপুর পট্টোলী (৯৯০-১০১০), ত্রিপুরা রাজমালা (১৫৫৯), চৈতন্য চরিতামৃত, জাওড়ি বারোস (১৫৬০), ফানডেন, রোক (১৬৬০), রেনেল (১৭৭১), প্রভৃতি ঐতিহাসিকদের বিবরণে পদ্মানদীর বিচিত্র গতি পরিবর্তনের ইঙ্গি পাওয়া যায়। এখাড়া মির্জা নাথানের বাহিরিস্তান-ই-গায়েবী (১৬৬৪), শিহাবুদ্দিন তালিস (১৬৬৬), টেভানীয়ার (১৬৬৬), হেজেস (১৬৮২), প্রভৃতি ভ্রমণকারীদের বিবরণেও পদ্মা’র একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। পদ্মার এই বিচিত্র গতি পরিবর্তনের ফলে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা জনপদটি বহুবার তার আয়তন ঠিক রাখতে পারেনি। ডঃ নীহার রঞ্জন রায় বলেছেনঃ “পদ্মানদী এক সময় রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়া হয়ে চলন বিলের মধ্য দিয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর সংগে মিশে সাগরে পড়ত।” এ সময়ে পাবনার এক বিরাট অংশ কুষ্টিয়া অঞ্চলের সংগে যুক্ত ছিল। চলার পথে পদ্মা অসংখ্যা শাখা-প্রশাখা-স্রোতা-খাল-কোল ইত্যাদি রেখে গেছে।

পদ্মা অত্যন্ত বিপুল বেগে কুষ্টিয়া ও পাবনা জেলার সীমা নির্ণয় করে বয়ে যেতো। রাজশাহীর পর কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার সর্ব পশ্চিম প্রান্ত ছুঁয়ে কুষ্টিয়া ও কুমারখালী থানার সর্ব পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত প্রবাহিত। কুষ্টিয়ার রায়টা, দামুকদিয়া, ভেড়ামারা, শিলাইদহ, আজুদিয়া হয়ে পাবনার সাতবাড়িয়ার গা ছুঁয়ে চলে গেছে গোয়ালন্দের দিকে। শিলাইদহ থেকে আজুদিয়া পর্যন্ত পদ্মা যে বিরাট বাঁক ফেলেছে তা অত্যন্ত বিস্ময়কর। ভেড়ামারার নিকটে ১৯১৫ সালে পদ্মার উপর হাডিঞ্জ ব্রীজ তৈরি হয়। এই ব্রীজটি লম্বায় এক মাইলের কিছু বেশী। ব্রীজটিতে ১৮টি স্প্যান আছে। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রেলসেতু। এই ব্রীজটিকে কেহ সাঁড়ার ব্রীজ, কেহ পাকশী ব্রীজ, কেহ বা ভেড়ামারা হাডিঞ্জ ব্রীজও বলে থাকেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তান বাহিনী হাডিঞ্জ ব্রীজের পূর্ব প্রান্তের দুইটি স্প্যান বোমার আঘাতে নষ্ট করে। পুনরায় ব্রীজটি ’৭৪ সালে মেরামত করা হয়।

পদ্মার বিচিত্র গতিপথের বিবরণ অসংখ্য। শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত প্রথম রেললাইন চালু (১৮৬২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী) হওয়ার সময় পদ্মা কুষ্টিয়া শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো বলে জানা যায়। বর্তমান পুরাতন কুষ্টিয়াা (গড়াইয়ের ওপারে) গ্রামটি পদ্মার ভাঙ্গনে অনেকটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৫০ সালের দিকে এই নদী পাবনা শহরের পাশ দিয়ে কয়েক বছর প্রবাহিত ছিল। পাবনার শীতলার জমিদারী বাড়ী (বর্তমান এডরুক ঔষদ কারখানা) ও ভাঁড়ালা গ্রামের মসজিদ পদ্মা প্রায় গ্রাস করে নিয়েছিল। ১৯৬৭-৬৮ সাল পর্যন্ত পদ্মা দিয়ে বড় বড় স্টিমার এবং মাল বোঝাই নৌকা বার মাস যাতায়াত করতো। বর্তমানে বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ে বিশেষতঃ গ্রীষ্মকালে লঞ্চ বা বড় নৌকা যাতায়াত করতে পারেনা।

পদ্মানদীর যে সকল শাখা প্রশাখা সৃষ্টি হয়ে কুষ্টিয়া জেলা অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত সেগুলি হলো গড়াই, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব ইত্যাদি। পদ্মা দ্রুত গতি পরিবর্তন করে, কোন সয় অন্তঃসলিলারূপে প্রবাহিত হয়। এরূপ চঞ্চল জলস্রোত খুব অল্প নদীতেই দেখা যায়। এ নদী কুষ্টিয়ার মানুষের বড়ই প্রিয় নদী। পদ্মাই কুষ্টিয়ার প্রাণ। পদ্মার ইলিশ মাছ কুষ্টিয়ার এক বড় সম্পদ কিন্তু সে আজ মরণোন্মুখ। ১৯৭৬ সালে ভেড়ামারা ব্রীজের কাছে পদ্মার পানি সতের ফুটে নেমে আসে। ভাতরতের কারাক্কায় বাঁধ দিয়ে গঙ্গার প্রধান স্রোত ভাগীরথী দিয়ে প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরকে বার মাস জাহাজ চলাচলের উপযোগী করার যে চেষ্টা নেওয়া হয় তাতে (গঙ্গাকপোতাক্ষ প্রকল্প অধ্যায় দ্রষ্টব্য) হওয়ার ফলে গ্রীষ্মকালে পদ্মা মোটামুটি নব্য রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। সমগ্র কুষ্টিয়াসহ বাংলাদেশের সাতটি জেলার প্রায় দুই কোটি মানুষ পদ্মানদীর জলধারার উপর নির্ভরশীল। তাই পদ্মানদীর মরণোন্মুখ অবস্থা এই জনপদের অসংখ্য মানুষের জীবন মরণ সমস্যা। কুষ্টিয়াবাসী বারমাস অশান্ত প্রমত্তা পদ্মা দেখে অভ্যস্ত। সে পদ্মা হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

গড়াই নদী:  গড়াই পদ্মার অন্যতম প্রধান শাখা নদী। এই কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। গড়াই কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল উত্তর-পশ্চিমে তালবাড়ীয়ার নিকট পদ্মা থেকে বের হয়ে কুষ্টিয়া শহরের উত্তর প্রান্ত ছুঁয়ে কুমারখালী শহরের দক্ষিণপাশ দিয়ে বয়ে গেছে। পরে এ নদী যশোর ও ফরিদপুরের সীমা রক্ষা করে খুলনা জেলা হয়ে বাকেরগঞ্জ জেলার সীমা রক্ষা করে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। গড়াই কুষ্টিয়ার মধ্যে কালীগঙ্গা ও ডাকুরা নামক দুটি প্রশাখার জন্ম দিয়েছে। গড়াই কুষ্টিয়ার বড় নিজস্ব নদী। গড়াইয়ের তীরে কুষ্টিয়া শহর, হরিপুর, কয়া, সেঁউড়িায়া জয়নাবাদ, লাহিনীপাড়া, চড়াইকোল, কুমারখালী, যদুবয়রা প্রভৃতি গ্রাম অবস্থিত। গড়াইয়ের অপর একটি ক্ষীন স্রোতধারা ‘বুড়ি গড়াই’ কুষ্টিয়া শহরের পশ্চিম উত্তর প্রান্ত থেকে বের হয়ে বাড়াদী গ্রামকে পৃথক করে জগতির পাশ দিয়ে সাইবাড়ীয়ার বিলে মিশেছে। এর আর একটি প্রাচীন স্রোত বুড়ীগড়াইয়ের উৎসমুখ থেকে বের হয়ে পুরাতন সার্কিট হাউস ও রেলালাইনের উপর দিয়ে মজমপুর গ্রামের মধ্য দিয়ে আধুনিকী করণ হাসপাতালের পাশ দিয়ে গাড়াদহের বিলে পড়তো। বহুকাল পূর্বে এই ধারাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

গড়াই নদী সম্বন্ধে নানারূপ বক্তব্য। ডঃ নীহার রঞ্জন রায় বলেনঃ “চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতার বিবরণের আগে বহুদিন এই প্রবাহের কোন সংবাদ পাওয়া যাইতেছে না। তিনি আরও বলেনঃ “বর্তমান কুমার নদী পদ্মা উৎসারিত। মাথাভাঙ্গা নদী হইতে বাহির হইয়া বর্তমান গড়াইর সংগে মিলিত হইয়া বিভিন্ন অংশ গড়াই, মধুমতি, শিলাইদহ, বালেশ্বর নাম লইয়া হরিণঘাটায় গিয়া সমুদ্রে পড়িয়াছে। এ অনুমান যুক্তিসঙ্গত যে এই সমগ্র প্রবাহটি যথার্থ নাম ছিল কুমার এবং কুমারই পরে বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন নামে পরিচিত হইয়াছে। গড়াই নদী কুষ্টিয়া জেলা অতিক্রম করলেই মধুমতি নামে পরিচিত। একই কারণে কুমারও ছিল কুষ্টিয়ার নদ।

দশ শতাব্দীর শেষে এবং একাদশ শতাব্দীর সূচনায় চন্দ্রদ্বীপ-হরিকেলের চন্দ্রবংশীয় রাজাদের মধ্যে মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তাঁর ইদিলপুর (ফরিদপুর জেলায়) পট্টলি দ্বারা ‘সতট পদ্মাবতী বিষয়ের’ ‘কুমারতালকমণ্ডলে’ একখণ্ড জমিদানের বিষয় জানা যায়। ডঃ নীহার রঞ্জন রায় এই ‘কুমারতলক’কে কুমারনদী তীরবর্তী স্থান বলতে চেয়েছেন। এ কথা স্বীকার করলে কুমারকে প্রাচীন না হলেও অর্বাচীন নদী বলা যায় না। বিখ্যাত জ্যোতিবিজ্ঞানী ও ভৌগোলিক টলেমীর (১৫০ সাল) ‘অন্তর্গাঙ্গেয় ভারতবর্ষের (India-Intra-Ganges) নকসায় তদানীন্তন গঙ্গার প্রবাহের সাগর সঙ্গমে পাঁচটি মুখের যে উল্লেখ করেন তার মধ্যে ‘কম্বরিখান্’ (Kamberikhan) নামক মুখটিকে নলিনীকান্ত ভট্টশালী হরিণঘাটার মুখ বলেন কিন্তু নীহার রঞ্জন রায়ের মতে ঐটিই গড়াই নদী ছিল। তবে তখন তার নাম গড়াই ছিল কিনা তা জানা যায় না। ষোড়শ শতাব্দীতে কবি মুকুন্দ রাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ভূমিকাংশে স্বদেশ ত্যাগের সময় বলেন:-

“বহিয়া গড়াই নদী সদাই স্মরিয়ে বিধি তেঁউটায় হইলু উপনীত। দারুকেশ্বর তরি পাইল বাতন-গিরি (পাওলপুর) গঙ্গাদাস বড় কৈল্যা হিত নারায়ণ পরাশর এড়াইল দামোদর উপনীত কুচট্টা; নগরে।”

কোন কোন গ্রন্থে ‘বহিয়া গড়াই নদী’ স্থলে “বহিয়া মুড়াই নদী” উল্লেখ দেখা যায়। তাছাড়া গড়াইয়ের পথে তেউট্যা, দারুকেশ্বর, বাতনগিরি নামক স্থান কোথায় ছিল জানা যায় না। দামোদর নদ অতিক্রম করে ‘কুচট্যানগর’ অন্য কোন স্থান হ’লেও কুষ্টিয়া হ’তে পারে না।

গড়াইয়ের উৎস মুখ আগে ছিল শিলাইদহের নিকটে। বর্তমান কুঠিবাড়ীর পশ্চিমদিক থেকে গড়াই প্রবাহিত ছিল। বর্তমান শতাব্দীর সূচনায় কুষ্টিয়ার তালবাড়ীয়া গ্রামের সামান্যা উত্তর দিকে ডাকদহের নিকট পদ্মায় স্রোতের প্রবল চাপ পড়ে বর্তমান উৎমুখের সৃষ্টি হয়। পদ্মা উত্তর দিকে সরে যাওয়ায় তালবাড়য়িা থেকে কুষ্টিয়া শহরস্থ কুঠিপাড়ার মসজিদ পর্যন্ত বড় কোল বা ডামোশ ফেলে যায়। ডাকদহের মুখ ভেঙ্গে এই কোল দিয়ে পদ্মা স্রোতে প্রবাতিহ হয়ে গড়াইয়ের নতুন মুখের সৃষ্টি করায় পুরাতন উৎস মুখ বন্ধ হয়ে সমতল ক্ষেতে পরিণত হয়। কোল ভেদে গড়াই তৈরী হওয়ার সময় তার দুই পার এমনভাবে ভাঙ্গতে থাকে যে তার নদী হতে বেশী দেরী হয় নাই। গড়ইয়ের বর্হমান উৎমুখ তৈরী হওয়ার সময় তার অবস্থা অতি শোচনীয় হয়েছিল। সে সময়ে গড়াই হেঁটে পার হওয়া যেতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিন্নপত্রে গড়াই সম্বন্ধে বলেছেনঃ যেন লেজ দোলানো কেশর ফোলানো ঘার বাঁকান তাজা বুনো ঘোড়ার মতো। আজ গড়াই অন্তিম দশায় ধুঁকে মরছে। ১৯৭৫ সাল থেকে গ্রীষ্মকালে গড়াইয়ের উপর দিয়ে লোকে হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে। ১৮৭১ সালে গড়াই নদীর উপর জৎয়নাবাদ চড়াইকোলের মধ্যে যে রেল সেতু তৈরী হয় সে সময় গড়াইয়ের ভাঙ্গন রোধ করার জন্য কুষ্টিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ নীলকুঠি বেঙে এনে তা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। গড়াইয়ের বুকে এখন বিরাট বিরাট চর। কুষ্টিয়া শহর রক্ষা বাঁধ, কুমারখালী রক্ষা বাঁধ বর্তমান শতকের ঘাট ও সত্তর দশকে তৈরী হয়। গড়াইতে আজকাল ইলিশ মাছ দূরে থাক কোন মাছই পাওয়া যায় না। গড়াই বর্তমানে যে অবস্থায় এসেছে তা সংস্কার করা না হলে মাথাবাঙ্গা , কুমার ও ভৈরবের মতো তারও মৃত্যু হবে।

মাথাভাঙ্গা নদীঃ  কুষ্টিয়া জেলার এককালের একমাত্র প্রধান নদী মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার উত্তরে জলাঙ্গী নদীর উৎসমুখের প্রায় দশ মাইল পূর্বে পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। দর্শনার পাশ দিয়ে আলমডাঙ্গা ষ্টেশনের প্রায় পাঁচ মাইল পশ্চিমে এসে কুমার ও মাথাভাঙ্গা নামে দুই শাখায় বিভক্ত হয়েছে। মাথাভাঙ্গা আলমডাঙ্গা রেল ষ্টেশনের কিছু পশ্চিম দিকে যেয়ে দক্ষিণে চুর্ণীনদীর সংগে মিলিত হয়ে পশ্চিম বাংলার বলাগড়েরর নিকট ভাগীরথীর সংগে মিশেছে। এককালে গঙ্গার প্রধান স্রোত মাথাভাঙ্গা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো। প্রায় চারশ বছর পূর্বে গঙ্গা যখন ভাগীরথী দিয়ে বইতো তখন নদীতল বালি পড়ে ভরে উঠলে জলাঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, ও গড়াই প্রভৃতি নদী দিয়ে তার প্রধান স্রোত বইতে থাকে।

শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া রেল লাইন চালু (১৮৬২) হওয়ার পূর্বে মাথাভাঙ্গা নদীপথেই কলকাতার সঙ্গে কুষ্টিয়া অঞ্চলের যোগাযোগ রক্ষিত হতো। কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, পাবনা প্রভৃতি অঞ্চলের যাবতীয় নীলকর এই নদীপথেই তাদের নীল কলকাতায় পাঠাত। ১৭৭১ সালে রেনেল যখন জরীপ করেন এবং ১৭৮০ সালে যখন তাঁর মানচিত্র প্রকাশ তাঁর মানচিত্র প্রকাশ হয় তখন গ্রীষ্মকালে মাথাভাঙ্গার বড় নৌকা চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ১৮৪৫ সালে কোম্পানীর সরকার মাথাভাঙ্গাকে বহতা রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। মাথাভাঙ্গার বড় বিপদ হয়ে দেখা দেয় তারই শাখা নদী কুমার। মাথাভাঙ্গার স্রোতে কুমারের মুখে এসে তার পানির পাঁচ ভাগের চার ভাগই কুমার দিয়ে প্রবেশ করায় মাথাভাঙ্গার বিপদ খুব ত্বরান্বিত হয়ে পড়ে।মাথাভাঙ্গাতে জাহাজ ও বড় বড় নৌকা চলাচলের অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় নীলকর সাহেবদের নীল রপ্তানীতেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয। এ কারনে নীলকর সাহেবরা জাহাজ কোম্পানীর কাছে প্রায়ই খেশারত (Demarage) দিতে বাধ্য হওয়ার তারা মাথাভাঙ্গাকে বহতা রাখার জন্য কোম্পানীর সরকারের নিকট অনুরোধ করে। নীলকরদের স্বার্থরক্ষার জন্য ১৮২০ সালে সরকার রবিনসন নামক একজন সাহেবকে মাথাভাঙ্গা সংস্কারের দায়িত্ব অর্পণ করেন। রবিনসন কুমার নদী মুখে বালি বোঝাই নৌকা ভুবিয়ে বেশী পানি মাথাভাঙ্গার প্রবেশ করিয়ে নদীটিকে জীবন্ত করার চেষ্টা করেন কিন্তু তাঁর সকল চেষ্টাই ব্যার্থ হয়। কুমার নদী অত্যন্ত এঁকে বেঁকে যাওয়ায় নৌ-চলাচলের অযোগ্য বিবেচিত হতো। উইলিয়াম হাণ্টারের এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে রবিনসনের পর মিঃ মে নামক একজন সাহেব মাথাভাঙ্গা সংস্কারের ভার গ্রহণ করেন। তিনি প্রায় কুড়ি বছর এই কাজে থেকে নানা উপায়ে কুমারের মুখ আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। এই কাজে প্রচুর অর্থ ব্যায় হয়। ১৮২০ সাল থেকে ১৮২৫ পর্যন্ত ছয় বছরে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করে ১৫৪০ গজ মাটি কেটে নদীর বাঁক পরিবর্তন করা, কুমারের মুখে বালি ভর্তি নৌকা আড়ভাবে ডুবিয়েও মাথাভাঙ্গা কে বহতা রাখা যায় নাই। কয়েকবার ড্রেজার দিয়ে মাথাভাঙ্গার স্রোতে বহতা রাখার চেষ্টা করা হয় কিন্তু এক স্থানের বালি খুব সামান্য দূরে যেয়ে পুনরায় চরার সৃষ্টি করায় সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

মাথাভাঙ্গা মরে যাওয়ায় কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অনুর্বর হয়ে পড়ে। এ ছাড়া নদীতে মশার জন্ম হওয়ায় এ অঞ্চলে ব্যাপক ম্যলেরিয়ায় হাজার হাজার লোক মারা য়ায়। মাথাভাঙ্গা দিয়ে এককালে বড় বড় জাহাজ ও নৌকা যাতায়াত করতো এ যেন রূপকথার গল্প বলে মনে হয়। মাথাভাঙ্গা মৃত্যুর সাথে সাথে এ অঞ্চলে দারিদ্র, রোগ-শোক বৃদ্ধি পায়। যে নদীকে এককালে এ অঞ্চলের মানুষ নাম দিয়েছিল মাথাভাঙ্গা সে মরে এ অঞ্চলের মানুষের মাথা সত্যিই ভেঙ্গে দেয়। এখন মাথাভাঙ্গা খালের আকারে জীবিত। তার উৎসমুখ বন্ধ। অন্তঃসলিলা রূপে খালের আকারে মাথাভাঙ্গা হয়ত আরও কিছুকাল জীবিত থাকবে তারপর একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে। মাথাভাঙ্গাকে সংস্কার করে জলাধার হিসাবে ব্যবহার করলে এ অঞ্চল আবার সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

কুমার নদঃ   কুমার মাথাভাঙ্গার শাখা নদ। কুষ্টিয়া জেলার আলমডাঙ্গা ষ্টেশনের পাঁচ মাইল পশ্চিমে মাথাভাঙ্গা থেকে উৎপন্ন হয়ে কিছু পূর্বদিকে এসে আলমডাঙ্গা ষ্টেশন দক্ষিণে ফেলে রেল লাইনের নীচে দিয়ে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। পথে সে গড়াইয়ের স্রোতধারার সংগে মিশে যাওয়ায় অনেকেই কুমারকে গড়াই মনে করতেন আবার কেহ কেহ গড়াইকেও কুমার মনে করেছেন। কুমার নদী দিয়ে বহুবার গঙ্গার প্রদান স্রোতধারা প্রবাহিত হয়েছে। মাথাভাঙ্গার পানির পাঁচ ভাগের চারভাগ কুমার দিয়ে প্রবেশ করায় মাথাভাঙ্গারে যেমন কপাল ভেঙ্গেছিল তেমনি কুমারেরও দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছিল। মাথাভাঙ্গাকে বার মাস বহতা রাখার জন্য কুমারের মুখে বালি বোঝাই নৌকা ডুবিয়ে তার স্রোত মাথাভাঙ্গা দিয়ে বহানোর চেষ্টা করে কুমারের গলা টিপে হত্যা করা হয়, মাথাভাঙ্গাকেও বাঁচান যায় নাই। কুমার যখন পরাভূত হলো তখন তার মোহনা মাথাভাঙ্গা থেকে ছয়ফুট উপরে এসে যায়। মাথাভাঙ্গার কুমারের মুখ থেকে তিন মাইল উঁচু বলির চরে ভরে যায়। যে কুমারে একদা নৌকা চালাতে পাকা মাঝিকে আতঙ্কিত হতে হোত সেই কুমারের বুকে বর্তমানে বর্ষাকালেও কলার ভেলায় সাত আট বছরের ছেলে নির্ভয়ে পারাপার করে। কুমারের বুজ নানা জলজ আগাছায় পরিপূর্ণ মশার আবাসস্থল। অথচ ১৮৮০ সালে ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্ণর স্যার জন পিটার গ্রান্ট কুমার নদীপথে কলকাতা থেকে সোনামুখী ষ্টিমারযোগে পাবনা গমন করেছিলেন।

উইলিয়াম হাণ্টার ১৮৭১ সালে এক প্রতিবেদনে বলেন যে ১৮৬১ থেকে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত দশ বছরে নদীয়ার নদীগুলি সংস্কারের জন্য ২,৪৯,৬৩২ পাউণ্ড (এক পাউণ্ড ১৩ টাকা ধরলে ৩২,৪৫,২১৬ টাকা) নদীয়াবাসীর নিকট থেকে টোল বা কর আদায় করা হয়। উক্ত টাকা থেকে সরকার নদী সংস্কারের জন্য খরচ করেন ১,৪৫,০৯৪ পাউণ্ড আর সরকার আত্মসাত করেন ১,০৪,৫৩৮ পাউণ্ড। ১৮১৩ সাল থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত ৭১ বছরে কুষ্টিয়া তথা অবিভক্ত নদীয়াবাসী মাথাভাঙ্গা রক্ষা আর কুমার ধ্বংশের জন্য কর দিতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ মাথাভাঙ্গা রক্ষার ব্যাপারটি ছিল নীলকরদের নীল রপ্তানীর ব্যবস্থা করা।

মাথাভাঙ্গা ও কুমার উভয় নদীকেই জোরপূর্বক ধ্বংশ করে তদানীন্তন বৃটিশ সরকার আর সেই সাথে ধ্বংশ করে এ জনপদের মানুষের আর্থিক মেরুদণ্ড। একদিকে নীলকরদের অমানুষিক নির্যাতন, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জলের অভাবে শস্য উৎপন্ন করার অসুবিধা। কুমার মরে যাওয়ার পর দীর্ঘকাল এ অঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় পানির অভাবে পাট জন্মাতে পারেনি। একই সাথে কুমার ও মাথাভাঙ্গা নদী এবং তার পূর্বে ভৈরব নদ মরে যাওয়ায় কুষ্টিয়া জেলা অঞ্চলের ইতিহাসই পরিবর্তন হয়ে যায়। এ কারণে এল অঞ্চলের ঐতিহ্য সংস্কৃতি সাহিত্য, শিল্প তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে পরিবর্তন দেখা দেয় যা কোন ঐতিহাসিক অথবা ভৌগোলিক উল্লেখ করেননি। এই অনুর্বর এলাকায় জলসেচের দারা ফসল ফলানোর জন্য ১৯৫৫ সাল থেকে জাতিসংঘের ফাণ্ড (FAO) এর উদ্যোগে গঙ্গাকপোতাক্ষ প্রকল্প গৃহীত হয়। কুমার সংস্কারযোগ্য নদ।

ভৈরব নদঃফান্ডেন রোকের (১৬৬০ খৃ:) নকসারয় জলাঙ্গী ও চন্দনা নামক পদ্মার যে শাখা নদী ভাগীরথীতে প্রবাহিত দেখান হয়েছে তার মধ্যে জলাঙ্গী নদী একদা ভৈরব নামে কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গার নিকট দিয়ে প্রবেশ করে যশোর ও খুলনা জেলার ভিতর দিয়ে গড়াই নদীর সংগে মিশে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। ভৈরব সম্বন্ধে ডঃ নীহার রঞ্জন রায় বলেনঃ “মধ্যযুগের এই নদীগুলির (চন্দনা, কুমার ও ভৈরব) মধ্যে ভৈরবও ছিল অন্যতম, কিন্তু সেই ভৈরব মরনোন্মুখ।” ভৈরব নদ দিয়েই নৌকা পথে খান জাহান গৌড় থেকে বারবাজার হয়ে বাঘের হাটে যান বলে ধরানা করা হয়। এ ধারনা সমর্থনযোগ্য। সম্রাট আকবরের সময় যশোরাধিপতি প্রতাপাদিত্যকে দমন করার জন্য রাজা মানসিংহ (১৫৮৯ সাল) জলাঙ্গী বা খ’ড়ে অর্থাৎ ভৈরব নদী পার হয়ে বাগোয়ানে ভবানন্দ মজুমদারের বাড়ী গমন করেন। ভারচন্দ্র অন্নদা মঙ্গলে উল্লেখ করেছেনঃ

“মজুমদার সংগে রঙ্গে খ’ড়ে পার হয়ে
বাগোয়ানে মানসিংহ যান সৈন্য লয়ে।”
……………………………………….
ধন্য ধন্য পরগণা বাগোয়ান গ্রাম
গাঙ্গিনীর পূর্বকূলে আন্দুলিয়া গ্রাম
তাহার পশ্চিম পারে বড়গাছি গ্রাম
যাহে অন্নদার দাস হরিহোর নাম।”

ভৈরব এককালে বিখ্যাত নদী ছিল। মাথাভাঙ্গা পশ্চিম বাংলার মাজদিয়া ষ্টেশনের কাছে ইছামতী ও চূর্ণী নামে বিভক্ত হয়েছে। ইছামতী চব্বিশ পরগণা জেলার ভিতর দিয়ে বাদাবনে সাগরে মিশেছে। চূর্ণী কলকাতার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাগীরথীতে মিশেছে। মাথাভাঙ্গার অপর প্রশাখা খ’ড়ে বা জলাঙ্গী কৃষ্ণনগরের পাশ দিয়ে নবদ্বীপের নিকট চূর্ণীতে মিশেছে। ভৈরব পশ্চিম বাংলার মুরটী গ্রামের নিকট জলাঙ্গী থেকে বের হয়ে মেহেরপুরের কাথলি উজোলপুর, মেহেরপুর শহর, বাগোয়ান, কাপাসডাঙ্গা হয়ে দর্শনার কাছে মাথাভাঙ্গাকে অতিক্রম (Cross) করে যশোরের বারবাজার হয়ে খুলনার ভিতর দিয়ে সাগরে পড়েছে। ভৈরব সম্বন্ধে বলা হয়েছে ঃ “ভৈরব একটি তীর্থ নদ কত নদীর নামে অন্য নদ আছে কিন্তু ভৈরবের নামে অন্য কোন নদ নাই। এক সময় ইতা নামের অনুরূপ ভয়ঙ্কর মূর্তিতে বিরাজ করিত।” এ নদী সম্পর্কে ১৮৪১ সালে মিঃ ইয়েস কাপাসডাঙ্গার খৃষ্টান মিশন ভ্রমণে এসে লিখে গেছেনঃ “A beautiful river whose banks are richly ornamented with fine trees and the water of which is truly excellent and wholesome,” ভৈরবের তীরবর্তী একালের মানুষের কাছে এ মন্তব্য অবিশ্বাস্য মনে হ’লে আশ্চর্যের কিছু নাই। ভৈরব সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তী গ’ড়ে উঠেছিল। লোকে তাকে জীবন্ত নদী মনে করতো। এখন ভৈরব একটি খাল মাত্র। বর্ষকালে সামান্য পানি হ’লেও গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে যায়। ১৮৭৩ সালে ভৈরব সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু সে চেষ্টা ছিল অতি সামান্য। ভৈরব সংস্কারযোগ্য নদ। ১৯৭৭ সালে ভৈরব পুনরায় সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছে। ভৈরব মরে যাওয়ার জন্য মেহেরপুর, দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা, বারবাজার প্রভৃতি পুরাতন বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র নব-জীবন লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। “গাঙ্গেয় বদ্বীপের অন্যতম প্রধান নদী” ভৈরব জীবন্ত হলে কুষ্টিয়া জেলার পশ্চিমাঞ্চল সম্পদশালী হবে বলে উক্ত অঞ্চলের লোকদের ধারনা।  

নবগঙ্গা নদীঃ নবগঙ্গা নদী কুষ্টিয়অ জেলার চুয়াডাঙ্গা শহরের মুচীপাড়ার নিকট মাথাভাঙ্গা থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রথমে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে বাঁক নিয়ে যশোরের ঝিনাইদহ শহরের ভিতর দিয়ে চলে গেছে মাগুরায়। মাগুরার নিকট সে কুমারের সংগে মিশে ভৈরব নদীতে গিয়ে পড়েছে। নবগঙ্গা “চিত্রার মতই পূর্বে ইছামতী নদীর শাখা ছিল। বর্তমানে মুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ইটা ভৈরবের একটি উপনদী। এই নদীটিতে জোয়ারভাটা খেলে।” নবগঙ্গা বর্তমানে নৌ-চলাচলের অযোগ্য আগাছা ও কচুরী পানায় পূর্ণ একটি খাল বিশেষ। নবগঙ্গার পাশে ঝিনাইদহ শহর গড়ে উঠেলিছ। নবগঙ্গার মৃত্যুতে এ শহর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নবগঙ্গা তার নামকরণেই তার স্বভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে। নবগঙ্গা আলমডাঙ্গা থানায় খালের চেয়েও খারাব অবস্থায় এসে গেছে। এ নদী সংস্কার হলে চুয়াডাঙ্গার সংগে ঝিনাইদহের নৌÑযোগাযোগ স্থাপিত হতে পারে। পুনরায় সে যোগযাযোগ স্থাপিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের যথেষ্ট উন্নতির সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।

কালীগঙ্গা নদী: কুষ্টিয়া শহরের পূর্বপ্রান্তে ছেউড়িয়ার নিকট শ্মশানঘাট থেকে কালীগঙ্গা নদী গড়াই হ’তে উৎপন্ন হয়ে রাহিনীর পাশে রেল লাইনের নীচ দিয়ে যেয়ে যশোরের কুমারের সংগে মিশেছে। পূর্বে এ নদী খরস্রোতা ছিল এবং লঞ্চ, বড় নৌকা যাতায়াত করতো। তিরিশ বছর পূর্বেও লঞ্চ যাতায়াত করেছে এ নদীপথে। ১৮৬৫ সালের দিকে কুষ্টিয়া থেকে রেল লাইন গড়াই তীর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় গড়াই ব্রীজ তৈরির জন্য। তখন কালীগঙ্গার উপর বাঁধ দিয়ে নদীটিকে দুইভাগ করে ফেলা হয়। পরবর্তীকালে ঘাট দশকে কুমারের মুখে পুনরায় বাঁদ দেওয়া হয়। ১৯০০ সালে কালীগঙ্গার ভাঙ্গনে ধলনগর ও পদ্মানগর নামক গ্রাম দটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তখন কালীগঙ্গা থেকে একটি স্রোতধারা খাল আকারে বের হয়ে বারাদী বিল হয়ে লক্ষ্মীপুরের নিকট কুমারের সংগে মিলিত হয়। কালীগঙ্গা এখন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

ডাকো নদী: কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার হলুদবাড়ী বাঁদপুরের নিকট গড়াই থেকে ডাকোনদী উৎপন্ন হয়ে পান্টির ভিতর দিয়ে যশোরে যেয়ে পুনরায় গড়াইয়ের সংগে মিলিত হয়। পুরাতন ভালুকা থানা ডাকো নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। প্রায় তিরিশ বছল পূর্বেও এ নদী তীব্র খর¯স্রোতা ছিল এবং তখন বড় বড় ব্যবসায়ী নৌকা, লঞ্চ ইত্যাদি যাতায়াত করতো। কিছুকাল পূর্বে বাঁধ দিলে নদীমুখ বন্ধ হয়ে একটি একটি খালে পরিণত হয়। কচুরি পানা ও নানা জলজ আগাছায় নদীটি পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় মশার উপদ্রব অত্যন্ত বেড়ে গেছে। এ কারণে এ নদীর দুই পাড়ের লোকের কাছে নদীটি বর্তমানে একটি অভিশাপ বলে মনে হয়।

হিসনা নদী: হিসনা পদ্মার একটি শাখা নদী। কুষ্টিয়া জেলার মহিষকুণ্ডির নিকট পদ্মা থেকে বের হয়ে খাদাপুর, বাগোয়ান, মথুরাপুর, হোসেনাবাদ, তারাগুনিয়া, আল্লার দরগাহ, পাটোয়াকান্দী, ধরমপুর প্রভৃতি গ্রামের মধ্য দিয়ে মওলা হাবাসা পাহাড়পুর, আমলাসদরপুর হয়ে চাঁপাইগাছির বিলে পড়েছে। এ নদী কিছু কাল পূর্বেও নৌ-চলাচলের যোগ্য ছিল। বর্তমানে হিসনা মৃত। নদীমুখ বন্ধ হয়ে বাঁধ দেওয়া হয়। এই সাগরখালী বাঁধ দেওয়ার ফরে সাগরখালীতে পানির প্রবল চাপ পড়ে, প্রায়ই কৃষকের ক্ষেত-খামার পানিতে ডুবে যায়।

মরা গড়াই: ভেড়ামারার নিকট পদ্মা থেকে বের হয়ে মীরপুরের পাশ দিয়ে কিছু যেয়ে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। এ নদীর নাম এ অঞ্চলে মরা গড়াই দেখে মনে হয় এটি বহু আগে আসল গড়াই ছিল। বর্তমানে এটি একটি ডামোশ আকারে কোন রকমে অস্তিত্ব রক্ষা করছে।

ভাইমারা নদীঃ ভাইমারা নদী চুয়াডাঙ্গার হাঁটুভাঙ্গা গ্রামের নিকট মাথাভাঙ্গা থেকে উৎপন্ন হয়ে হেমায়েতপুর, শালদহ, শালিখা, মোচাইনগর, নানবার, আলীপুর, কয়রাড্গাা, গোকুলখালী হয়ে সুবলখালী গ্রামের নিকট মাথাভাঙ্গাতেই মিশেছে। এ নদী দৈর্ঘে প্রায় পঁচিশ মাইল। ভাইমারা নদীর পাশে অসংখ্য নীলকুঠি গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে নদীট মৃত।

ছোট নদী: তিড়াইল বিল থেকে বের হয়ে মালশাদহ, হারিদহ, ধানকোলা, বারাদীর পাশ দিয়ে দীনদত্ত গ্রামের কাছে মাথাভাঙ্গায় মিশেছে। ছোটো দৈর্ঘে প্রায় তিরিশ মাইল। তিড়াইল বিল এবং ছেটো নদী দুটিই শুকিয়ে মরে গেছে।

মড়কা নদী:  কুষ্টিয়া জেলার সিন্দুরকৌটা গ্রামের নিকট মাথাভাঙ্গা থেকে বের হয়ে কাটদহ বিল দিয়ে বেণীপুকুর, সিমুলতলা, হাড়িদহ গ্রাম হয়ে ধানকোলার নিকট ছোটো নদীর সংগে মিশেছে। এ নদীর দৈর্ঘ প্রায় পনের মাইল। বর্তমানে মড়কা একটি খাল মাত্র। 

কোল বা ডামোশ: নদী স্থান পরিবর্তন করার সময় যে সব পুরাতন খাত ফেরে যায় তাকে কোল, ডামোশ, ভাঙশ, দহ, ‘দ’ ইত্যাদি নামে বিভিন্ন স্থানে পরিচিত হয়। নদী বহুল অঞ্চলে এ ধরনের বড় বড় কোল বা ডামোশ প্রায়ই দেখা যায়। এ সব কোল সারা বছর পানি থাকে, বর্ষাকালে নদীর সাথে মিশে একাকার, হয়ে যায়। কুষ্টিয়া জেলায় যে সব কোল বা ডামোশ আছে সেগুরি হোলঃ তালবাড়ীয়ার কোল, জগন্নাথপুরের কোল, শিলাইদহের কোল, আমবাড়ীয়ার কোল, মহিষকুণ্ডের ডামোশ, কেঁচোডাঙ্গার ডামোশ, খনির বাওর, কচুদহের ডামোশ ইত্যাদি। বর্তমানে শিলাইদহ থেকে আজুদিয়া পর্যন্ত পদ্মার যে বিরাট বাঁধ দেখা যায় তা মাত্র দশ পনের বছরে পদ্মার ভাঙ্গনে সৃষ্টি। এ অঞ্চলে পদ্মা তিন চারা বার ফিরে এসেছে আবার উত্তর দিকে তিন চার মাইল সরে গেছে। চর আমবাড়ীয়া, ধোকড়াকোল, মকলুর চর, খাশচর প্রভৃতি এলাকায় বহুবার বসতি গড়ে উঠেছে আবার পদ্মাগর্ভে তলিয়ে গেছে বর্তমানে এ অঞ্চলে কয়েকটি বড় বড় কোলের সৃষ্টি হয়েছে। কচুদহের পাশ দিয়ে একট বড় ডামোশ চরে গেছে। এ ডামোশের স্থানে স্থানে গভীর পানি রয়েছে অনুরূপ ভাবে স্বস্তিপুরের ভিতর দিয়ে একটি নদীর চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। কলাবাড়ীদহ থেকে বের হয়ে শিমুলিয়া হয়ে চাঁপাইগাছির বিলে মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় বার চৌদ্দ মাইল আর প্রস্তে তিনশত গজ। বর্ষকালে ছাড়া অন্য সময়ে প্রায় শুকিয়ে যায়।

বিল-বাওর: কুষ্টিয়া জেলায় বিল-বাওরের সংখ্যা ছিল প্রচুর। এ ব বিল-বাওরগুলি নদীর কোল বা ডামোশ থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। ধীরে ধীরে আবার পলি মাটিতে এগুলির অনেক বরে যেয়ে সমতল মাঠে পরিণত হয়েছে। কুষ্টিয়াতে যে সব বিল রয়েছে সেগুলি হোল: সর মহকুমার: চাঁপাইগাছির বিল, আমলার বিল, বারাদী বিল, বোয়ালির বিল, চড়াইকোলের বিল, কাদিরপুরের বিল, ষোলদাগের বিল, মহিষকুÐির ডামোশ, সাগরখালীর বিল, তালবাড়ীয়ার বিল ইত্যাদি। চুয়াডাঙ্গা মহকুমায়: বরাদী বিল, একতারপুর বিল, হারদা বিল, কমলাদহ, কালীয়ার বিল, খাদিমপুর বিল, কুমারী বিল, নেহালপুর বিল, পদ্মা বিল, রুইসার বিল, সংবরচন্দ্র বাওর, তেরক্ষের বিল, নুরার বিল, তিড়াইল বিল ইত্যাদি। মেহেরপুর মহকুমায়: বিলধলা, চাঁদ বিল, বিলকোলা, গোপালপুর বিল, পাঠাবুকার বিল, খাল মাগরা, বামুনদীর বিল, পানকিয়া বিল, খলিশাগুড়িরর বিল ইত্যাদি।

উপরোক্ত বিলগুলিতে বর্ষাকালে পানিতে ভরে যায়, অনেকগুলিতে বার মাস পানি থাকে না। বিল, খাল, খালীদহ, চর, কোল, ভাঙ্গা, দিয়ার, কুণ্ডি প্রভৃতি পানি সম্পর্কিত নামে এ জেলার অসংখ্য গ্রাম রয়েছে। যথা: শিলাইদহ, কচুদহ, পোড়াদহ, শালদহ, চড়াইকোল, মহিশকুণ্ডি, খলিসাকুণ্ডি, ধোনাইকুণ্ডি, পদ্মবিলা, ঘোষবিলা, দৌলৎখালী, মহিষাখোলা, দোপাখালী, কচুইখালী, কড়চাভাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা শান্তিাভাঙ্গা চর হরিপুর চর আমবাড়ীয়া মনোহর দিয়া (র) কন্দর্পদিয়া, চক মাজালিয়া, ভীমেরদিয়ার ইত্যাদি। এ সব পানি সম্পর্কিত নাম থেকে একথা প্রমাণ হয় যে এ জেলায় এককালে অসংখ্যা বিল-বাওর-কোল ছিল। সেগুলি পদ্মা-গড়াইয়ের পলিমাটিতে ভরাট হয়ে গেলেও গ্রামগুলির নামের মধ্যে তার স্মৃতি জাগরূক রয়েছে।

—————

পদটীকা: ১। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহঃ বাংলা সাহিত্যের কথা ১ম খণ্ড, পূঃ ৬৬,
২। ডঃ নীহার রঞ্জন রায়ঃ বাংলার নদ-নদী, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, ১৯৫৪, পৃ: ২৮,
৩। ডঃ নীহার রঞ্জন রায়ঃ বাংলার নদ-নদী, পৃঃ ২৮,
৪। প্রাগুপ্ত, পৃঃ ২৯,
৫। শ্রীশ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীবিশ্বপতি চৌধুরী সম্পাদিতঃ কবি কঙ্কন চণ্ডী, ১ম ভাগ, পূনর্মুদ্রিত সংস্করণ, ১৯৬২, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ: ৩১.
৬। মুহঃ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা সম্পাদিতঃ কালকেতুর উপাখ্যান, ষ্টুডেণ্টওয়েজ ঢাকা, ১৯৬৭, পৃ: ৪.
৭। প্রমথনাথ বিশীঃ শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ, ১৩৭৯ পৃ: ৬১.
৮। বাকল্যাণ্ডঃ বেঙ্গল আণ্ডার লেফটেন্যাণ্ট গভর্ণরস, ১ম খণ্ড, ২য় সংস্করণ ১৯০২, পৃঃ ২৫৭-৫৮
৯। The District Gazetteer: Kushtia এর খসড়া,
১০। ডঃ নীহার রঞ্জন রায়ঃ বাংলার নদ-নদী, ১৩৫৪, পৃঃ ৩৩,
১১। আঃ কাঃ মোঃ যাকারিয়াঃ বারবাজারঃ যশোর জেলার একটি গ্রাম, লোক সাহিত্য পত্রিকা, ১ম বর্ষ, ১ম শাখা, ১৯৭৫, পৃঃ ৬৭,
১২। ভারত চন্দ্রঃ অন্নদা মঙ্গল ( মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যান, মহঃ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা সম্পাদিত) ১ম সং, ১৯৬৭, পৃঃ ১১,
১৩। অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র মিত্রঃ যশোর খুলনার ইতিহাস, ১ম খÐ, ৩য় সংস্করণ ১৯৬৩, (শিব শঙ্কর মিত্র সম্পাতিত) কলকাতা, পৃঃ ২১,
১৪। J. H. E Gurrett : Bengal District Gazetteers; Nadia, 1910, p, 171
১৫। এ. এফ, এম, আবদুর জলিলঃ সুন্দবনের ইতিহাস, ২য় ও ৩য় খণ্ড, ১৩৭৬ সন, পৃঃ ৩২,
১৬। খান বাহাদুর আবদুল হাকিমঃ বাংলা বিশ্বকোষ, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২১

তথ্যসূত্র: কুষ্টিয়ার ইতিহাস, লেখক: শ ম শওকত আলী (এমএবিএড), প্রকাশিকা: মণিকা শওকত, মণিকা কুটির, মজমপুর, কুষ্টিয়া। প্রকাশ কাল: ১লা নভেম্বর, ১৯৭৮