মুজিবনগরে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার

শামসুল হুদা চৌধুরী

আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের মাটিতে। আর ১০ই এপ্রিল ‘৭১ প্রবাসে ভারতের আগরতলায় বিপ্লবী সরকার গঠন করলেন। সদ্য গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এর রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ জিবুর রহমান। কিন্তু তখন তিনি ছিলেন হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দী। কাজেই তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেলেন তাজউদ্দিন আহমদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পিত হ’ল যথাক্রমে খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলী এবং জনাব কামরুজ্জামানের ওপর। কর্ণেল (অব) আতাউল গনি ওসমানীর ওপর অর্পিত হ’ল প্রধান সেনাপতির দায়িত্বভার ।
১৭ই এপ্রিল ‘৭১ সদ্য গঠিত বিপ্লবী সরকার দেশী বিদেশী সাংবাদিকের উপস্থিতিতে আত্মপ্রকাশ করল কুষ্টিয়া জেলাধীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার আম বাগানে।
স্থানীয় গ্রামবাসী থেকে কিছু চেয়ার-টেবিল এনে খোলা মাঠের এক কোনে গাছতলায় সাজিয়ে একটি সভামঞ্চের রূপ দেয়া হ’ল।
ঐদিন বেলা পূর্বাহ্ন ১১টা ১০ মিনিট সময়ে কুষ্টিয়া জেলার বৈদ্যনাথ তলায় আয়োজিত ঐ সভামঞ্চের পশ্চিম দিক থেকে এলেন নেতৃবৃন্দ। উপস্থিত জনতা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে নেতৃবৃন্দকে স্বাগত জানালেন। সদ্য গঠিত সশস্ত্র বাহিনীর একটি দল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিবাদন জানালেন। এরপর নেতৃবৃন্দ একে একে নির্ধারিত আসনে বসলেন। প্রথমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তারপর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, তারপর মন্ত্রী খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলী, জনাব কামরুজ্জামান এবং প্রধান সেনাপতি কর্ণেল আতাউল গনি ওসমানী। স্বেচ্ছাসেবকগণ পুষ্প দিয়ে তাদের অভিবাদন জানালেন।
কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথ তলায় আয়োজিত ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন জনাব আবদুল মান্নান। শুরুতে পবিত্র কোরআন শরীফ থেকে তেলাওয়াত করা হ’ল। নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের চীফ হুইপ । অধ্যাপক ইউসুফ আলী। নবগঠিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাম হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’।
চারটি ছেলে প্রাণ ঢেলে গাইল ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। তার পর উঠে দাঁড়ালেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী পদে তাজউদ্দিন আহমদ এবং তার পরামর্শে আরও তিনজনের নাম ঘোষণা করলেন তিনি। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি একে একে পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর তিন সহকর্মীকে। এর পর তিনি নতুন রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্ণেল (পরে জেনারেল) আতাউল গণি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ পদে কর্ণেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করলেন।
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজ-উদদৌলা তাঁর স্বাধীন নবাবী হারিয়েছিলেন। আর ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল সেই প্রাচীন বাংলার আর এক আম্রকাননে আত্মপ্রকাশ করল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার।
কুষ্টিয়া জেলাধীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার নতুন নামকরণ হ’ল মুজিবনগর। এই মুজিবনগরই ঘোষিত হ’ল বাংলাদেশ-এর অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে। অবশ্য নতুন বিপ্লবী সরকারের আত্মপ্রকাশের মাত্র দু’ ঘণ্টা কালের মধ্যেই হানাদার বাহিনী এলাকাটিকে পুনর্দখল করে নিয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে মুজিবনগর প্রশাসনকে সুবিধামত মুক্তাঞ্চলে নিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে মুজিবনগর। নামের আর পরিবর্তন হয়নি।
নবগঠিত অস্থায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী হিসেবে এই মুজিবনগর নামই সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী এবং বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত ছিল ‘৭১এর স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ শপথ অনুষ্ঠান শেষে মুজিবনগরের এই ঐতিহাসিক সম্মেলনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এক সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাণস্পর্শী ভাষণ দেন। তিনি তাঁর ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বারবার বললেন। শুধুমাত্র তার নেতৃত্ব এবং স্বার্থ ত্যাগ এবং সংগ্রামী জীবনই যে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদেরকে বাঁচার প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে সে কথা তিনি বারবার উল্লেখ করলেন। সদ্য ঘোষিত রাজধানী মুজিবনগরের পাদপীঠ কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তার ঐতিহাসিক ভাষণে বললেন :
‘আজ এই আম্রকাননে একটি নতুন জাতি জন্ম নিল। বিগত বহু বৎসর যাবত বাংলার মানুষ, তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ঐতিহ্য, নিজস্ব নেতাদের নিয়ে এগুতে চেয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানি কায়েমী স্বার্থ কখনই তা হতে দিল না। ওরা আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। আমরা নিয়মতান্ত্রিক পথে এগুতে চেয়েছিলাম, ওরা তা দিল না। ওরা আমাদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালাল। তাই আজ আমরা লড়াইয়ে নেমেছি। এ লড়াইয়ে আমাদের জয় অনিবার্য। আমরা পাকিস্তানি হানাদারদেরকে বিতাড়িত করবোই। আজ না জিতি কাল জিতব। কাল না জিতি পরশু জিতবই। আমরা বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান চাই। পরস্পরের ভাই হিসেবে বসবাস করতে চাই। মানবতার, গণতন্ত্রের এবং স্বাধীনতার জয় চাই।
আপনারা জানেন, পাকিস্তানের শোষণ এবং শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গত ২৩ বছর ধরে বঙ্গবন্ধু সব স্বাৰ্থ পরিত্যাগ করে আন্দোলন করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার। আমি জোর দিয়ে বলছি তিনি আমাদের মধ্যে আছেন। জাতির সংকটের সময় আমরা তার নেতৃত্ব পেয়েছি। তাই বলছি পৃথিবীর মানচিত্রে আজ যে নতুন রাষ্ট্রের সূচনা হ’ল তা চিরদিন থাকবে। পৃথিবীর কানো শক্তি তা মুছে দিতে পারবে না। আপনারা জেনে রাখুন, গত ২৩ বছর ধরে বাংলার সংগ্রামকে পদে পদে আঘাত করছে পাকিস্তানের স্বার্থবাদী, শিল্পপতি, পুঁজিবাদী ও সামরিক কুচক্রীরা। আমরা চেয়েছিলাম শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের অধিকার আদায় করতে। লজ্জার কথা, দুঃখের কথা ঐ পশ্চিমারা শেরেবাংলাকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়েছিল। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে কারাগারে পাঠিয়েছিল। তাই ওদের সঙ্গে আপোষ নেই, ক্ষমা নেই।
আমাদের রাষ্ট্রপতি জন-গণ-নন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, নির্যাতিত মানুষের মূর্ত প্রতীক শেখ মুজিব বাংলার মানুসের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দী। তাঁর নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম জয়ী হবেই।
জয় বাংলা।”
——————————————

তথ্যনির্দেশ:
মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর। শামসুল হুদা চৌধুরী, সায়ীদ হাসান চৌধুরী, বিজয় প্রকাশনী, ৪০৭/১-সি, মণিপুর, মীরপুর ঢাকা-১৬। ফেব্রুয়ারি ১, ১৯৮৫, পৃষ্ঠা ৭১-৭৪।
—————-
শামসুল হুদা চৌধুরী, স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে’র পরিচালক।
———————
তথ্যসূত্র:
বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড), সম্পাদনা: বিলু কবীর, সিকদার আবুল বাশার, গতিধারা, ঢাকা, প্রকাশ কাল: সেপ্টেম্বর, ২০১৭।