কুষ্টিয়া জেলার উত্তর পশ্চিম এবং উত্তরে পদ্মা নদীর অপর তীরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলা, পশ্চিমে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং ভারতের নদীয়াও মুর্শিদাবাদ জেলা এবং পূর্বে রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত। ভারতের সাথে কুষ্টিয়ার ৪৬.৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আছে।ভৌগোলিক বিবরণ ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে কারণ সংক্ষেপে কুষ্টিয়া জেলার ভৌগোলিক বিবরণ দেওয়া হলো।

সীমানা ম্যাপ

সীমা: কুষ্টিয়া জেলার পূর্বে ফরিদপুর জেলা, দক্ষিনে যশোর জেলা, উত্তরে পদ্মানদী, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিবঙ্গের নদীয়া ও মুর্শীদাবাদ জেলা। কুষ্টিয়ার উত্তরে পদ্মানদীর অপর পারে পাবনা জেলা। উত্তর পশ্চিমে রাজশাহী জেলা। কুষ্টিয়া বর্তমান বাংলাদেশের সবংপশ্চিম সীমান্ত জেলা।

আয়তন: বাংলাদেশের বর্তমান উনিশটি জেলার মধ্যে আয়তনে কুষ্টিয়া আঠারতম জেলা। বাংলাদেশের মোট আয়তন ৫৪,৫২৬ বর্গমাইলের মধ্যে কুষ্টিয়ার আয়তন ১৩৭১ বর্গমাইল। ১৯৭৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড প্রকাশিত ক্যালেণ্ডারে এ জেলার আয়তন দেখানো হয়েছে ১৩৪২ বর্গমাইল। ১৫ বর্গমাইল মত এলাকা পদ্মানদীর গ্রাস করেছে। পদ্মার যে বিরাট চর রয়েছে তা নদীর গতিপথের জন্য কোন সময় কুষ্টিয়া আবার কোন সময়ে পাবনা জেলাধীন হয়। পদ্মানদীর উত্তর পাড়ে এই বিরাট চরাঞ্চল বর্তমানে পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত। পুরাতন রেকর্ডপত্রে পদ্মার এই সকল চর ধোকড়াকোল, খাশচর, গোবিন্দপুর, চরআমবাড়ীয়া, পোড়াবাদা প্রভৃতি অবিভক্ত নদীয়া জেলা এমন কি দীর্ঘকাল কুষ্টিয়া জেলারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পদ্মানদী ক্রমশঃ দক্ষিণে সরে আসছে আর কুষ্টিয়ার আয়তন হ্রাস পাচ্ছে। মহকুমা অনুযায়ী আয়তন সদর মহকুমা ৬২৩ বর্গমাইল, মেহেরপুর মহকুমা ২৭৭ বর্গমাইল এবং চুয়াডাঙ্গা ৪৪২ বর্গমাইল।

অবস্থান:  কুষ্টিয়া ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ থেকে ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংমে এবং ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থান করে।

ভূ-প্রকৃতি: কুষ্টিয়া জেলা গাঙ্গেয় অববাহিকার অন্তর্গত সমতলভূমি। দক্ষিনবঙ্গ ও পশ্চিম বাংলার কলিকাতা, ডায়মণ্ডহারবার সহ সমগ্র অঞ্চলটি গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল। কত বছর পূর্বে এ অঞ্চল সমুদ্রগর্ভ থেকে জেগে উঠেলিছ তা এখনও নির্ণীত হয়নি। হবে কুষ্টিয়া জেলা পাবনা ও যশোরের মতই পুরাতন গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল। গঙ্গা বা পদ্মানদীর বারবার গতি পরিবর্তন, তার শাখা প্রশাখার ভাঙ্গাগড়ায় কুষ্টিয়া জেলারও অধিকাংশ অঞ্চল বরাবর ভেঙ্গেছে গড়েছে। এ অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন পাওয়া যায় না এ কারণেই। কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস প্রাচীন না হলেও একেবারে অর্বাচীনও নয়। পার্শ্ববর্তী যশোর ও পাবনা জেলা পুরাতন হ’লে মধ্যবর্তী কুষ্টিয়া জেলা প্রাচীন বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। ভূ-প্রকৃতি অনুসারে কুষ্টিয়া জেলাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১। বর্তমান সক্রীয় গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল- ১০৩.৭ বর্গমাইল
২। অতি অল্পকালের গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল ৩৫.১ ”
৩। অল্পকালের গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল ১৭২.৭ ”
৪। পুরাতন গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল- ৬৫৬.৭ ”
৫। মিশ্রিত অল্প ও পুরাতনকালের গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল ৩৭০.৭ ”

কুষ্টিয়া জেলার দক্ষিণাংশ ও দক্ষিণ পশ্চিমাংশ প্রাচীন গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল। আবার উত্তরাংশ নতুন সক্রীয় গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল। চুয়াডাঙ্গা মহকুমার বিস্তৃত অঞ্চল অসংখ্য নদ-নদী বেষ্টিত ছিল। তাই এ অঞ্চলে ভাঙ্গাগড়া হয়েছে বারবার। মেহেরপুর ও সদর মহকুমার কুমারখালী, খোকসা থানা প্রাচীন পুরাতন গাঙ্গেয় বন্যা প্রবাহিত পলিমাটি অঞ্চল। কুষ্টিয়ার পূর্বাঞ্চলের তুলনায় পশ্চিমাঞ্চল কিছুটা উঁচু।

ভূ-তত্ত্ব: কুষ্টিয়া জেলার ভূমি পলি অথবা দো-আঁশ মাটি দ্বারা গঠিত। মধ্য কুষ্টিয়া অঞ্চলে সামান্য এঁটেল মাটি দেখা যায়। পদ্মা গড়াইয়ের প্লাবনে নদী সন্নিহিত অঞ্চলে প্রতি বছর পলিমাটি পড়ে। উত্তরে চরাঞ্চলে এই প্রক্রিয়া প্রতি বছরই চলছে। কুষ্টিয়া জেলার এক সময় কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, কালীগঙ্গা, ডাকুয়া প্রভৃতি নদ-নদী তীর খরস্রোতা ছিল। এসব নদীর ভাঙ্গাগড়া চলতো, বন্যা হোত। যার ফলে সমগ্র জেলার মাটিরও পরিবর্তন ঘটতো। এ জেলার ভূ-তত্ত্ব সম্বন্ধে ১৮৭০ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির এক রিপোর্ট ডঃ থমাস ওয়াল্ডহেম বলেন: It is impossible to suppose a river continuing to flow along the top of a raised bank. If not compelled to do so by artificial means and the consequence of this filling in and raising of its bed is that, at the first opportunity, the streams necessarily abandons its original course, and, seeks a new channel in the lower grounds adjoining, until after the whole flat and raised the entire surface to the same general level.” কুষ্টিয়া জেলার মাটি নদীর সৃষ্টি এবং নদীই কুষ্টিয়ার প্রাণ। কুষ্টিয়া জেলার মৃত্তিকা স্তরের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে এই জেলায় বালি, পাতলা ও মোটা মিশানো পলি, কাদা, নুড়ি ও কাঁকর মিশানো বালি দ্বারা গঠিত। তবে বেশীর ভাগ এলাকায় মাটির উপরের স্তরে বালি মিশানো দো-আঁশ মাটি আর মাত্র কয়েক জায়গায় রয়েছে এঁটেল মাটির প্রলেপ।

পানির স্তর:   কুষ্টিয়া জেলার মৃত্তিকা স্তরের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে এই জেলায় ভূগর্ভের পানি সাধারণভাবে ভূ-পৃষ্ঠের অনেক গভীরে স্থিত ও পর্যাপ্তভাবে সঞ্চিত। জেলার সর্বত্র ভূ-গর্ভস্থ পানির সীমা দশ ফুট থেকে পনের ফুটের মধ্যে। কোন কোন স্থানে কুড়ি ফুট থেকে তিরিশ ফুট পর্যন্ত রয়েছে। সাধারণতঃ নদী তীরবর্তী অঞ্চলে এবঙ চুয়াডাঙ্গা মহকুমার কোন কোন স্থানে বেশী গভীরতায় পানি রয়েছে। কুষ্টিয়ার ভূ-গর্ভস্থ পানি থাকে সাধারণতঃ প্রমুক্ত জলমগ্ন স্থরে (Unconfined aquifer)। এ জেলার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০ থেকে ৪০ ফুটের ঊর্ধ্বে অবস্থিত। এ উচ্চতা উত্তর পশ্চিম কোণে বেশী আর দক্ষিণ পূর্ব কোণে কম। উত্তর পশ্চিম কোণ থেকে পূর্ব দক্ষিণ কোনে ঢালু রয়েছে। তাই এ জেলার পানি এই ঢাল অনুযায়ী ধীর গতিতে নড়াচড়া করছে।

কুষ্টিয়ার জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত হয় দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর বঙ্গোপসাগরীয় ধারায়। বৃষ্টিপাত ও প্লাবনের ফরে এবং গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচের কারণে পানির ঊধাংশ সম্পৃক্ত মণ্ডলে (Zone of saturation) যুক্ত হওয়ায় নভেম্বরের শেষ নাগাদ পানির ঊর্ধসীমা শেষ স্তরে পৌঁছায়। আবার গ্রীষ্মকালে অর্থাৎ এপ্রিল মে মাসে পানির স্তর নেমে যায় বাষ্পীভবন, গাছের স্বেদন এবং গভীর ও অগবীর নলকুপের যান্ত্রিক পানি সরবরাহের চাপে। সম্পৃক্ত মণ্ডলে ভূ-গর্ভের পানি সাধারণতঃ সুষম পর্যায়ে থাকে অর্থাৎ বাষ্পীভবন, স্বেদন, নিষ্কাশন প্রভৃতির ফলে যে পরিমাণ পানি বেরিয়ে যায় তা আবার পূর্ণও হয়। পানির স্তর তাই থাকে ঠিক অবিচলিত। কিন্তু পদ্মানদীর পানি গ্রীষ্মকালে অস্বাভাবিক নেমে যাওয়ায় পানির স্তরও নেমে যায়।
মাথাভাঙ্গা, কুমার, ভৈরব প্রভৃতি নদী মরে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গা ও সদর মহকুমার দক্ষিণাংশ অনুর্বর হয়ে পড়েছিল। গঙ্গাকপোতাক্ষা সেচ প্রকর্পে গঙ্গার পানি সেচ দ্বারা এ অঞ্চলের পানির অভাব পূরণ করা হয়। এ জেলায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত থেকে পর্যন্ত জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসে। প্রাকৃতিক পানি বৃষ্টিপাত কৃষির উপর নির্ভরশীল থাকায় জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে দেওয়ায় পানি সেচ একান্ত প্রয়োজনীয় পড়ে । বাহাত্তর সালের পর থেকে কুষ্টিয়া জেলার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরে কিঞ্চিত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। গ্রীষ্ককালে নলকূপে পানির কমতি পড়ে। পদ্মা গড়াই এবং অন্যান্য নদ-নদীতে পানির যে স্বাভাবিক গভীরতা তা না থাকলে এ জেলা মরুভূমি হয়ে যেতে পারে। পানিই কুষ্টিয়ার প্রাণ, পানি সমস্যাই কুষ্টিয়ার প্রধান সমস্যা। ভূ-গর্ভে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ নদ নদীর সংগে সম্পৃক্ত বলে নদ নদীতে স্বাভাবিক পডানি প্রবাহ থাকা প্রয়োজন। তা না থাকলে ভূ-গর্ভে পানির সরবরাহ অত্যন্ত কম হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই পানীয় জলের সরবরাহ এবং কৃষি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাবে ফসল ফলানো দুঃসাধ্য হবে।

জলবায়ু:  কুষ্টিয়া জেলার জলবায়ু সমভাবাপন্ন। গ্রীষ্মকারে উষ্ণ ও আর্দ্র এবং শীতকালে জলবায়ু শুষ্ক থাকে। শীত ও গ্রীষ্মের উষ্ণতার তারমত্য ফারেনহাইট থেকে ডিগ্রী ফারেনহাইটের বেশী নয়। কুষ্টিয়া জেলায় গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি পাতের সাধারণ গড় থেকে । মে মাস থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাস পর্যন্ত চলে। জেলার পশ্চিমাংশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছু কম। শীতকালে আবহাওয়া প্রায় শুষ্ক থাকে। শীতকালে থেকে বৃষ্টিপাত। তাই জেলা পুরাপুরি নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার অন্তর্গত। বাংলাদেশের ঋত প্রভাব কুষ্টিয়াতে ভালভাবেই লক্ষিত হয়।

আবহাওয়া পরিবর্তনশীল। কুষ্টিয়ার আবহাওয়র সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পঞ্চাশ ষাট বছুর পূর্বে এ জেলায় শীতের প্রকোপ যত তীব্র ছিল এখন আর তৎ তীব্র নেই বলে প্রবীণ লোকেরা মন্তব্য করে থাকেন। পূর্বে বৃষ্টিও কার্ত্তিক অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত চলতো না। এখন কোন কোন বছরে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত বৃষ্টি হ’তে দেখা যায়। আবহাওয়ার পরিবর্তন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যাপার বলেই সহজে চোখে ধরেনা। এ জেলায় বসন্তকাল ছাড়াও গ্রীষ্ম, বর্ষা এমন কি শীতকালেও মাঝে মধ্যে কোকিলের ডাক শোনা যায়।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়: অতীতে কুষ্টিয়া জেলা অঞ্চলে কয়েকবার প্রবল বন্যা হয়েছে। ১৮২৩, ১৮৩৭, ১৮৫১, ১৮৬৪, ১৮৬৭, ১৮৭১, এবং ১৮৮৭ সালের প্রবল বন্যায় এ অঞ্চলের বহু ঘরবাড়ী বিনষ্ট হয় এবং বহু লোক মারা যায়। ১৮৬৪ সালে কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গা অঞ্চলে এক প্রবল সাইক্লোন হয়েছিল। যার ফলে এ অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ অঞ্চলে তখন ভয়ানক মশার উপদ্রবে ভীষণ ম্যালেরিয়া মহামারী আকারে যে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল, উক্ত সাইক্লোনের ফলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কয়েক বছর একদম বন্ধ হয়ে যায়। ১৯০০, ১৯৩০, ১৯৩৮, ১৯৪৮, ১৯৫৪, ১৯৫৫ সালের বন্যায় কুমারখালী থানার হাসিমপুর, মহেন্দ্রপুর, জগন্নাথপুর আমবাড়ীয়া, কণ্ঠগজরা, সেনগ্রাম প্রভৃতি গ্রামগুলি ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কুমারখালী, খোকসা, দৌলতপুর থানায় পদ্মা গড়াইতে প্রায় প্রতি বছর বর্ষাকালে বন্যার প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়। ১৯৫৩ সালে আলমডাঙ্গা ও গাংনী থানায় প্রবল টর্ণেডো হয়। এই টর্ণেডোতে নলকুপ তুলে ফেলে। মাত্র কয়েক মিনিটকাল স্থায়ী টর্ণেডো ১৮ বর্গমাইল এলাকার জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে দুই বছর স্থায়ী দুর্ভিক্ষে এ জেলার কয়েক হাজার লোক মারা যায়। সরকারী লঙ্গরখানায় বজরা নামক এক প্রকার ভূরা জাতীয় চালের সালে লবণ-হলুদ-মরিচ সহযোগে জাউ তৈরী করে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হোত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কুষ্টিয়ার মীরপুর ও সদর থানায় প্রবল বন্যা হয়। কুষ্টিয়া শহরে এতবড় বন্যা এর আগে আর কোন বছর হয় নাই। কুষ্টিয়ার প্রধান সড়কের উপর দিয়ে নৌকা চলে এই বন্যায়। বর্তমান নতুন কালেক্টরী ভবনের বারান্দায় ২৫ হাত নৌকা বেঁধে রাখা হতো সরকারী কর্মচারীদের জন্য। সে সময়ে ব্যবহৃত একটি নৌকা এখনও কালেক্টরী ভবনের পেছনে পড়ে আছে। পাকিস্তানী সৈন্যদের চলাচলের অসুবিধা সৃষ্টি করার জন্য মুক্তিবাহিনী ও গ্রামবাসীরা সাগরখালীর বাঁধ ভেঙ্গে দিলে এই বন্যার সৃষ্টি হয়।

কুষ্টিয়া জেলায় ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম। পদ্মা-গড়াইতে প্রতি বছল বর্ষাকালে এবং অন্য সময়ে নৌকা ডুবিতে গড়ে একশত লোক মারা যায়। প্রায় প্রতি বছর বন্যার ফলে কুষ্টিয়ার খাল-বিল গলি সব ভরাট গয়ে যায়। যার ফলে পদ্মা-গড়াইয়ের পানি সহজেহই গ্রামগুলিকে ভাসিয়ে দেয়। এসব ছোট-খাটো বিপর্যয়ে বহু লোক মারা যায় এবং প্রচুর ক্ষতি হয়।

উদ্ভিদ রাজি: কুষ্টিয়া জেলায় স্বাভাবিকভাবে বর্তমানে উদ্ভিদের সংখ্যা শতকরা পাঁচ ছয় ভাগ মাত্র। শতকরা পনের ভাগ উদ্ভিদ থাকা প্রয়োজন বলে বন বিভাগ কয়েক বছর ধরে বৃক্ষ রোপন অভিযান চালাচ্ছে। এ জেলায় বর্তমানে কোন বড় জঙ্গল নাই। তিন চার শত বছর পূর্বে গোঁসাই ও কুমারখালী অঞ্চলে গভীর বন ছিল। কুষ্টিয়ায় বাঘ ও শুকর থাকার মত জঙ্গল তিরিশ চল্লিশ বছর আগেও যথেষ্ট ছিল কিন্তু চায়ের জমি ও জ্বালানীর প্রয়োজনে এসব জঙ্গলের অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে এ জেলায় ১’১৭ একর জমিতে বন জঙ্গল দেখানো হ’লেও প্রকৃত পক্ষে তার অস্তিত্ব নাই।

কুষ্টিয়া জেলায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত নানা প্রকার গাছ পালা ও লতাগুল্ম রয়েছে। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও মীরপুর অঞ্চলে মেহগনি, শাল প্রভৃতি মূল্যবান গাছ দেখা যায়। এ ছাড়া নীলকর সাহেবদেরা কুঠির আশেপাশে, রাস্তার ধারে ঝাউ, কাঠবাদাম, রেনট্রি, ইউক্যালিপটাস প্রভৃতি বিদেশী গাছ লাগিয়েছিল তার কিছু কিছু এখনও দেখা যায়। মেহেরপুর শাহ ভালাইয়ের দরগাহে একটি রবার গাছ ছিল কিন্তু কিছুকাল পূর্বে গাছটি কেটে ফেলানো হয়। পূর্বে গ্রামের সদাশয় ব্যক্তিগণ গাছ-পালা লাগাতেন। অনেক সময় তাঁরা জোড়া গাছ লাগিয়ে তাদের বিবাহ উৎসব পালন করতেন। এক কাল বাঁশ ও বেত ছিল কুষ্টিয়ার একটি বড় সম্পদ কিন্তু বর্তমানে এগুলি অনেক কমে গেছে। এছাড়া অন্যান্য ফলমূল ও ওষধি জাতীয় গাছপালা ও লতাগুল্ম যা রয়েছে তা বাংলাদেশের সর্বত্রই দেখা যায় বলে উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

ফলমূল: কুষ্টিয়া জেলায় বাংলাদেশের সকল জাতীয় ফলমূল উৎপন্ন হয়। তবে এ জেলার উল্লেখযোগ্য ফল হোল আম। মেহেরপু, চুয়াডাঙ্গা ও আমলায় বড় বড় উন্নতজাতারেত আমবাগান আছে। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার (মুজিব নগর, ৭১ এর ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার শপথ গ্রহণ করেন এখানে) বিরাট আমবাগান যে কোন লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চুয়াডাঙ্গা মহকুমাতেও প্রচুর আম, কাঁঠাল ও লিচুর বাগান আছে। এসব আম, কাঁঠাল ও লিচু প্রচুর পরিমাণে অন্যত্র চালান যায়। কলাও এ জেলায় প্রচুর জন্মে। তবে আমের দিক থেকে রাজাহীর পরেই কুষ্টিয়ার স্থান।

জীব-জন্তু: কুষ্টিয়া জেলায় শত বছর পূর্বেও ……..বন্য শুকরের উপদ্রপড ছিল। এখন এসব প্রাণী আর নাই। এমনকি মানুষখেকো কেঁদো বাঘও আর দেখা যায় না। এ জেলায় বাঘদাসা, সজারু, বেজী, খরগোস, নেউল, বন বিড়াল, গুইসাপ এবং নদীতে শুশুক ও বড় আকারের কচ্ছপ দেখা যায়। এ জেলায় বিষাক্ত সাপের মধ্যে গোখরাই প্রধান। গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, ঘোড়া, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি গ্রহপালিত জন্তু বাদে গাধা ও খচ্চর খুব সামান্যই দেখা যায়।   

পাখি: বাংলাদেশে যে সকল বিচিত্র পাখি রয়েছে তার অনেকগুলিই কুষ্টিয়াতে আছে। তবে শীতকালে কুষ্টিয়ার বিল ও নদীর চরে প্রচুর বিদেশী পাখির আমদানী হয়। কুষ্টিয়ার রায়েটা ( ভেড়ামারা থেকে ট্রেনযোগে যাওয়া যায়) শীতকালে পাখি শিকারীরে একটি বিশেষ আকর্ষণী স্থান। এ ছাড়া পদ্মানদীর চর, সাইবাড়ী বিল প্রভৃতি স্থানে কায়েম, নল কাক, জলকাক, দলপিঁপি, কাদাখোঁচা, ভিলভিলা, কোঁড়া, ঘ্যাংড়াল, নরাইল, সরাইল, ঢ়রহাঁস, মানিকজোড়া, ভেওরা, কাস্তেচোখা, শামুকভাঙ্গা, রামশালিক, সাদা ও কালো বক, রামবক, বাটাম ইত্যাদি জাতির অসংখ্য পাখি পাওয়া যায়। ডাঙ্গাতে ঘুঘু, হরিয়াল, কবুতর, ভরই, সাতভায়রা (ভারক?) প্রভৃতি পাখি রয়েছে। শুকুন, বাজ, কুল্লো, শঙ্কচিল, মাছরাঙা, গাংচিল, কাক, জলচোরা, দোয়েল, কোয়েল, শ্যামা, কোকিল, ফিঙে, বুলবুলি, সাহেব বুলবুলি, শালিক, কাঠঠোকরা, কুটুম পাখি, হলদে পাখি, বউ কথা কও, কানাকুয়া, পেঁচা, টুনটুনি, নাককাটি প্রভৃতি অসংখ্যা পাখি রয়েছে ও জেলায়। এসব পাখির মধ্যে কতকগুলি কয়েকটি প্রজাতি আছে।

মাছ: কুষ্টিয়া ছিল এককালে মাছের দেশ। এ জেলায় অসংখ্যা নদীনালা, খালবিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। নদী ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছ বর্তমানে অসম্ভব হ্রাস পেয়েছে। পদ্মা নদীর ইলিশ মাছের কথা কে না জানে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, শিলাইদহ ও আমবাড়ীয়ার ইলিশ মাছের বাঁকে বর্ষাকালে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ ধরা হতো। গড়াইয়ের ইলিশ মাছ ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু। পদ্মায় বর্ষাকালে কিছু ইলিশ মাছ ধরা হলেও গড়াইতে এখন ইলিশ দুষ্প্রাপ্য। অন্যান্য মাছ বাংলাদেশে যা পাওয়া যায় তা এ জেলাতেও অল্প বিস্তর রয়েছে। সারা বছর কুষ্টিয়াতে ইলিশ মাছ ১২/১৪ টাকা, রুই মাছ ১৮/২০ টাকা এবং অন্যান্য ছোট মাছ ১০/১২ টাকা সের দরে বিক্রয় হয়। কুষ্টিয়ার মরা নদীগুলিতে এবং গঙ্গাকপোতাক্ষ খালে মৎস চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। মাছের দেশ কুষ্টিয়াতে মাছ ক্রমশঃ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। 

——————-

তথ্যসূত্র: কুষ্টিয়ার ইতিহাস, লেখক: শ ম শওকত আলী (এমএবিএড), প্রকাশিকা: মণিকা শওকত, মণিকা কুটির, মজমপুর, কুষ্টিয়া। প্রকাশ কাল: ১লা নভেম্বর, ১৯৭৮